২৪-এর জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে ফেনীতে কয়েকজন শিক্ষার্থী অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও ক্রমেই সেটি গণআন্দোলনে রুপ নেয়। স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার হাজারো শিক্ষার্থীর সাথে অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষ এক দফার ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়।
মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে হামলা-সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের অত্যাচার নির্যাতন যত বাড়তে থাকে আন্দোলনও তত উত্তাপ ছড়ায়।
ঢাকার সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে ফেনীতেও জুলাইয়ের শেষ দিকে সমন্বয় কমিটি গঠনের লক্ষ্যে তৎপর হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। ওই সময় বেশ কিছু নারী শিক্ষার্থী অগ্রণী ভূমিকা রাখে। যোগাযোগ রক্ষায় নারী শিক্ষার্থীরা বোরকা বা মাস্ক পরে আন্দোলনকারীদের সাথে খবরা-খবর আদান-প্রদান করেন।
ফেনীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে দেশের সবকটি আন্দোলন সংগ্রামে ফেনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মতো নারীদের অংশগ্রহণ এর আগে হয়নি।’
তার মতে, একদিকে নারীদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী সরকারের জুলুম নিপীড়ন মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। যে কারণে মা-বোনরাও আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন। অনেকে সরাসরি রাজপথে নেমে আসেন। এ গণঅভ্যুত্থানের সফলতায় তাদের ভূমিকা ছিল মুখ্য।
কোটা বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকে সক্রিয় থাকা তরুণ গণমাধ্যমকর্মী শহিদুল ইসলাম জানান, ‘শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের আগের দিন ৩৫ জুলাই (৪ আগষ্ট) শহরের মহিপালে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্বিচার গুলিতে ১১ জন ছাত্র-জনতা প্রাণ হারান। রাজধানীর বাইরে আর কোনো জেলায় একসাথে এত লাশ পড়েনি। তৎকালীন সরকার দলীয়দের অব্যাহত হুমকি-ধামকি ও গ্রেফতারের আতঙ্ক মাথায় থাকলেও তবুও অদম্য সাহসী এসব ছাত্র-ছাত্রীরা পিছপা হয়নি। আন্দোলন বেগবান করতে অগ্রভাগে থাকা ১৮ জনকে দিয়ে সমন্বয়ক কমিটি করা হয়। এই কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয় ২৭ থেকে ২৮ জুলাই থেকে। কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী তাদের পেছন থেকে উৎসাহ যোগায়।’
ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের দিনগুলো ছিল দু:সহ। তখন ফ্যাসিবাদ উৎখাত করতে ছাত্ররা মূল্যবোধের জায়গা থেকে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামি। ফেনীর ছোট্ট একটি শহরে আন্দোলন করা ছিল কঠিন। ওই সময়ে গণইফতার আয়োজনে ছাত্রলীগ হামলা চালালে আমিসহ বেশ কয়েকজন আক্রমনের শিকার হই। ওই দিন থেকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠে।’
ফেনী সরকারি কলেজের গণিতের এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, ‘৬ জুলাই থেকে আমরা অল্প কয়েকজন নিয়ে আন্দোলনে নামি। ওই দিন পুলিশ বাধা দিলে মাইক নিয়ে আসা রিকশাওয়ালা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বিকেল বেলা তাকে খুঁজে বের করে মাইক পুনরুদ্ধার করি। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, গণঅধিকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিই। মূল আন্দোলন শুরু হয় ১৬ জুলাই। পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৭ তারিখ পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বানচাল করতে মহিপালে জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক নুর করিম জাবেদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ আরেকটি গ্রুপ ট্রাংক রোডে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের হানাদার বাহিনীর মতো তল্লাশি চালায়। শহীদ মিনারে মেয়েদের উপর নির্যাতন করা হয়। অনেককে ধরপাকড় করে পিটিআইতে নিয়ে মারধর করা হয়। ওই দিন শহীদ মিনারের সামনে ট্রাংক রোডে জড়ো হলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। ১৮ জুলাই ফেনী সেন্ট্রাল হাই স্কুলের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে বের হয়ে বড় মসজিদের সামনে এলে ছত্রভঙ্গ করা হয়। ওই দিনই প্রথম ফেনীতে গোলাগুলি হলে অনেকে আহত হয়। নারীদের উপরও পুলিশ সরাসরি আক্রমণ করে। ১৯ জুলাই ১৪৪ ধারা কারফিউর মধ্যে জহিরিয়া মসজিদের সামনে থেকে মিছিল বের হলে পুলিশ গুলি করলে। অনেকে চোখে-মুখে গুলিবিদ্ধ হয়। ২৬ জুলাই শিবিরের দায়িত্বশীল মুহাইমিন সাইমুনের পরিচালনায় গায়েবানা জানাযা হয়। ওই কর্মসূচিতে শিবির-ছাত্রদলের অনেকের উপস্থিতি দেখতে পাই। ফেনী ইউনিভার্সিটি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন এলাকায় গ্রাফিতি কর্মসূচি পালন করি।’
সাবেক আরেক সমন্বয়ক আবদুল কাইয়ুম সোহাগ বলেন, ‘৬ জুলাই আন্দোলন সংগঠিত করতে ৫ তারিখ রাতে আবদুল আজিজ ও তাজিমদের মাধ্যমে হার্ট ফাউন্ডেশনের সামনে বৈঠক হয়। ৬ তারিখ থেকে কোটা সংস্কার দাবিতে মাঠে সক্রিয় হয়। ছোট খাট প্রোগ্রাম, ব্লকেড হতে থাকে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আলোকে আবদুল্লাহ আল জোবায়ের, মোতাহের হোসেন তুহিন, আবদুল আজিজসহ কয়েকজন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দিই। স্মারকলিপি প্রদানের পর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে তাহমিদের মাধ্যমে পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা রেললাইনে ১৬ জুলাই আন্দোলন করে। ১৭ জুলাই শহীদ মিনারে আন্দোলন করতে গেলে আগে থেকে অবস্থান নেয়া ছাত্রলীগ কর্মসূচিতে আসা পিটিআই মাঠে নিয়ে মারধর ও শ্লীলতাহানী করে। বড় মসজিদের পেছন থেকে মিছিল বের করলে হামলা চালানো হয়। অনেকে বিভিন্ন ধরনের ছদ্মবেশে আমাদের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করতো।’
সোনাগাজী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগ আরো বলেন, ‘কর্মসূচির প্রচার করতে অনেকে কয়েকটি গ্রুপ ও ফ্যাক আইডি খোলা হয়। প্রতিটি গ্রুপে আড়াই শ’ করে মেম্বার ছিল। কর্মসূচি জোরালো শুরু হয় নেট শার্টডাউন, ছয়জন ডিবি হেফাজতে নেয়া। তখন খুবই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আমাদের মধ্যে কয়েকজনকে বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। কয়েকজনকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় এবং কয়েকজনকে কারাগারে পাঠায়। চোখে-মুখে লাল কাপড় বাঁধাসহ প্রতীকি প্রতিবাদও করা হয়। ২ আগস্ট জহিরিয়া মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃষ্টির মধ্যে ট্রাংক রোডে অবস্থান নিই। ৩ আগস্ট ট্রাংক রোডে কর্মসূচি করেছিলাম। ৪ আগস্ট ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরের সাথে সমন্বয় করে মহিপালে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিই। ওই দিন সকাল ১১টায় কর্মসূচি শুরু হয়। আগে থেকে ইসলামপুর রোডে ছাত্রদল নোতকর্মীদের উপর হামলা করে ছাত্রলীগ। মহিপালে পুরোপুরিভাবে ছাত্রশিবির যোগ দিয়েছিল। নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিলো ছাত্রশিবির। দীর্ঘক্ষণ কর্মসূচি চলার একপর্যায়ে যোহরের নামাজের পর ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা বিদেশী অস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র ভাইদের উপর হামলা করে। ঘটনাস্থলে সাতজন ভাই নিহত হয়।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুলতানা জেরিন ঝুমুর বলেন, ‘দিনটি ছিল ১৭ জুলাই, ২০২৪ ইং। মেঝো আপুর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আন্দোলনে যোগ দিই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণে আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন তিনি। এরপর ছিলেন সমন্বয়ক তাজিম ভাইয়া। ১৭ জুলাই ছিল মেয়ে আন্দোলনকারীদের জন্য একটা কালো দিন। ফেনীর শহীদ মিনারে সহযোদ্ধা ভাইদের সাথে বোনদের উপরও সন্ত্রাসলীগ বর্বর নিযাতন চালায়। চোখে-মুখে মরিচ গুড়ো দেয়া এবং লাঠি দিয়ে এলোপাথাড়ি মারধর করার মতো পৈশাচিক নির্যাতন চালায়।’
সাবেক এ সমন্বয়ক ঝুমুর আরো বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা নারী শিক্ষার্থীরা ছিলাম ফ্রন্টলাইনে। আমরা নারী সমন্বয়কদের বিশেষ কাজ ছিল আন্দোলনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক বোনদের জোগাড় করে পরের দিন সকালে নির্ধারিত স্থানে আন্দোলনের জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। দায়িত্বটি পালন করতে গিয়ে বহু রাত আমরা নারী আন্দোলনকারীরা নির্ঘুম কাটিয়েছি। অবশেষে ৪ আগস্ট আমাদের শহীদ কিশোর ভাইদের প্রাণ ও আহত ভাই-বোনদের রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশ অর্জন করতে পেরেছি।’
ওই সময় সহ-সমন্বয়ক ছিলেন ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউট শিক্ষার্থী তাসফিয়া তাসনিম। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-ফেনীর রাজপথে একের পর এক প্রতিবাদের ঢেউ। আমি তাসফিয়া তাসনিম, এক সাধারণ ছাত্রী, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, অথচ ওই দিনগুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে গেছি এক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাঁটায় ভরা পথে। ১৭ জুলাই, শহরের দোয়েল চত্বর থেকে শুরু হওয়া মিছিল যখন শহীদ মিনারের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখনই ছাত্রলীগের হঠাৎ আক্রমণে চারদিক ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আমার মাথায় লাঠির আঘাত, নাক দিয়ে রক্ত পড়া-তবু প্রাণ বাঁচানোর তাড়নায় দৌড়েছি। পাশে থাকা এক সহপাঠিনীর গায়ে অনেক বড় আঘাত করেছিল তারা, আর যাদের আটকে রাখা হয়েছে শহীদ মিনারের ভেতর, তাদের উপর নেমে এসেছে অমানবিক নির্যাতন।’
তাসফিয়া আরো উল্লেখ করেন, ‘ইন্টারনেট শাটডাউন, চারপাশের নীরবতা, তবু আমরা থামিনি। ভিপিএন দিয়ে যোগাযোগ, দেয়ালজুড়ে লেখা প্রতিবাদের শব্দ, মহাসড়কে অবরোধ, গলির মুখে মিছিল, যেখানেই পারি, আমরা দাঁড়িয়ে থেকেছি। ব্যানার ধরার লোক কম ছিল, তবু আমরা পিছু হাটিনি। আমাকে হুমকি দেয়া হয়েছে কলে, ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়েছে সহপাঠীদের কাছে। এমনকি আমার ক্যাম্পাসের কেউ আমায় সাহায্য করতে পারেনি। আন্দোলনের মধ্যে আমার উপর আবারো আক্রমণ, আবারো লাঠির আঘাত, ভেবেছিলাম একজন নারীকে অন্তত তারা এমন করবেন না। কিন্তু তারা পশুর মতো আচরণ করেছে। আমি ভয় পাইনি। নিজেকে আর শক্ত করে তুলেছিলাম। ৩ আগস্টের সমাবেশে শহরের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে, যা ছিল আমাদের জন্য অনেক বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর ৪ আগস্টের মহাসমাবেশে আমরাও পিছিয়ে যাইনি। যদিও আমাদের ভাইদের উপর নেমে এসেছে নতুন দমন-পীড়ন। ওই দিন ভাইয়েরা আমাদের নিরাপদে রাখতে পারলেও আমরা তাদের জন্য কিছু করতে পারিনি। এ শুধু আমার গল্প নয়, এ আমাদের সবার গল্প। এক নারীর চোখে দেখা, রক্ত-মাখা এক আন্দোলনের দিনলিপি। ব্যথা, ভয়, ভালোবাসা আর ন্যায্যতার লড়াই-সবকিছু মিলে এই ইতিহাস, যা আমি গর্ব করে বুকের মাঝে বহন করে চলেছি। আমরা আমাদের শহীদ ভাই-বোনদের রক্ত নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না। চাই সংস্কার, চাই অধিকার।’









