‘আপন ভাই ক্যামনে আমার সোনার সংসার তছনছ কইরা দিলো। যে ভাইরে আগলাইয়া রাখলাম, সেই ভাই সব শেষ কইরা দিলো। আমার সাজানো সংসার সব তছনছ করে সে পালিয়ে গেছে’- অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকায় দুই সন্তানসহ নিহত ময়না বেগমের স্বামী রফিকুল ইসলাম।
মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় রাফিকুল ইসলামের সাথে। রফিকুল কাঁদছেন, চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। তবুও তার বুকফাটা কান্না থামছে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন তিনি। এক রাতের মধ্যেই ঝড়ে শেষ হয়ে গেছে তার স্বপ্নের সাজানো বাগান। যাদের জন্য জীবনটা ছিল, তারা এখন আর নেই।
রফিকুল জানান, তাদের বিবাহিত জীবনে দু’টি সন্তান। মেয়েটা বড় বয়স ছয় আর ছোট ছেলেটার বয়স মাত্র দু’বছর। সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তা করে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালুকা চলে আসেন তিনি। একটি স্পিনিং মিলে শুরু করেন কাজ। নিয়েছেন দুই রুমের ছোট্ট একটা বাসা। ভালোই যাচ্ছিল তাদের দিনকাল। কিন্তু ছোট ভাইটার জন্য মন কাঁদে রফিকুলের। ছোট ভাই নজরুল দু’বছরের বেশি সময় ধরে জেল খাটছেন জয়দেবপুর থানার একটি হত্যা মামলায়। বড় ভাই রফিকুল ৪০ হাজার টাকা ঋণ করে ছোট ভাইয়ের জামিনের ব্যবস্থা করেন। নিজের ভাড়া বাসায় একটি কক্ষ ছেড়ে দিয়ে থাকতে দেন ছোট ভাইটাকে। সে রিকশা চালাতেন। রফিকুল ক’দিন ধরে বলছিলেন একটু বেশি করে কামাই করতে। ঋণের বেড়াজালে সংসার যে ভালোভাবে চলে না।
রোববার রাতে ডিউটিতে চলে যান রফিকুল। রাত ১০টার দিকে নজরুলের মোবাইলে কল দিয়ে স্ত্রীর সাথে কথাও বলেছিলেন তিনি। সকাল ৯টায় কারখানা থেকে বাসায় ফেরেন রফিকুল। ফিরে দেখেন বাসা তালাবদ্ধ। ডাকাডাকি করেন রফিকুল। কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই। তালা ভেঙে ঢোকেন ভেতরে। তিনজন বিছানায় শুয়ে আছে। কম্বল দিয়ে পুরো শরীর ঢাকা। কম্বলটা তুলতেই দেখেন স্ত্রী ময়না আক্তার (৩০), তার মেয়ে রাইসা (৭) এবং ছেলে নীরবের (২) গলা কাটা লাশ। স্তব্ধ হয়ে যান রফিকুল, মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে দেখেন মা-ছেলে-মেয়ে তিনজনকেই গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে পালিয়েছেন সেই ছোট ভাই নজরুল।
ভালুকা পৌরসভার টিঅ্যান্ডটি রোড এলাকার ভাড়া বাসায় এ ঘটনাটি ঘটে।
পুলিশ জানায়, রফিকুলের ছোট ভাই নজরুল ভালুকা পৌর এলাকায় এক ব্যক্তির কাছে সকাল ৮টার দিকে নিজের মোবাইল ফোনটি বিক্রি করে পালিয়েছেন। ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। বড় ভাইয়ের সাথে ভাড়া বাসায় থেকে তিনি অটোরিকশা চালাতেন। বাড়িটির যে কক্ষে নজরুল থাকতেন, সেখানকার খাটের নিচ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত দা উদ্ধার করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী আকতার উল আলম জানান, নিহতের দেবর নজরুল কথা কম বলতেন। অন্যদের সাথে মিশতেন কম। এসব কারণে ভাবির সাথে তার টানাপোড়েন চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনাটি পারিবারিক কারণে ঘটেছে।
তিনি আরো বলেন, এ ঘটনার পর থেকে দেবর পলাতক রয়েছেন। তবে ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং খুনিকে গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে।
খুব দ্রুত ঘটনাটি স্পষ্ট হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।









