আজ ২০ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের কলতাপাড়া হয়ে উঠেছিল এক জ্বলন্ত বারুদখানা। কারফিউ ভেঙে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অগ্নিশিখার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল গোটা এলাকায়। এ সংঘর্ষ কেড়ে নেয় তিনটি তাজাপ্রাণ। পুলিশের বুলেটে শতাধিক আন্দোলনকারীর রক্তের রঞ্জিত হয় পিচঢালা রাজপথ।
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন সেদিন গৌরীপুরবাসীর কাছে পরিণত হয়েছিল এক বিভীষিকাময় দিনে।
গত বছরের ২০ জুলাই। কারফিউ ভেঙে সকাল থেকেই গৌরীপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে একাত্মতা জানিয়ে আন্দোলনে যুক্ত হন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নেতাকর্মীরাও।
সকাল ১০টার মধ্যে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক ও গৌরীপুর কলতাপাড়া আঞ্চলিক সড়কে শত শত আন্দোলনকারী জড়ো হন। তাদের কণ্ঠে ছিল সরকারের পদত্যাগ, বৈষম্যহীন সমাজ চাই, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই। ব্যানার-ফেস্টুনে সয়লাব হয়ে যায় রাজপথ। শিক্ষার্থীদের স্লোগানে প্রকম্পিত হয় গোটা এলাকা।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। মহাসড়কে ও কলতাপাড়া মোড়ে পুলিশ প্রথমে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরাও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলতাপাড়া গৌরীপুর সড়কের প্রবেশ দ্বার তাল্লু স্পিনিং মিলের সামনে।
দুপুরের ঠিক একটু আগে পুলিশ সাঁজোয়া যান নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। তখন ছাত্র-জনতাও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা সড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে, ইট-পাথর ও গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো এলাকা সংঘর্ষে রূপ নেয়। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা পিছু হঠতে বাধ্য হন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও লাঠিসোটা নিয়ে তাদের উপর হামলা চালায়। এসময় পুলিশ আন্দোলনকারী জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন তিন শিক্ষার্থী বিপ্লব হাসান (১৯), জোবায়ের আহমেদ ( ২১) ও নুরে আলম সিদ্দিকী রাকিব (২০)। আহত হন শতাধিক আন্দোলকারী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্র মতে, ২০ জুলাই দুপুরের দিকে কলতাপাড়া এলাকায় আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন গুলিবিদ্ধ হন চুড়ালী গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে কলেজছাত্র বিপ্লব হাসান। তার মাথা ও বুকে একটি বড় গুলির ক্ষত দেখা যায়।
বিপ্লবের পরিবার ও আন্দোলনকারীদের ধারণা, পুলিশের ছোড়া গুলিতেই বিপ্লব মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সহপাঠীরা তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। রাত ৮টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে বিপ্লবের নিথর দেহ বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়। পুলিশের চাপে তড়িঘড়ি করে রাতে বাড়ির আঙিনায় তার লাশ দাফন করা হয়।
বিপ্লবের বাবা মো: বাবুল মিয়ার অভিযোগ, ২০ জুলাই সাবেক এমপির নির্দেশনায় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী লোকজন বিপ্লবকে গুলি করে হত্যা করে।
এ ঘটনায় ২৫০ জনের নামে মামলা হয়েছে। তবে এখনো চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ।
উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাঁও গ্রামের আব্দুল হালিম শেখের ছেলে শহীদ নুরে আলম সিদ্দিকী রাকিব। তিনি অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য ওষুধ আনতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার এমদাদুল উলুম নূরানীয়া হাফিজিয়া মাদরাসা থেকে হেফজ সম্পন্ন করেন রাকিব। এরপর নিজ বাড়িতেই গড়ে উঠা তালিমুল কোরআন মহিলা মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি ভর্তি হন ঈশ্বরগঞ্জের ভাসা আতহারিয়া দারুল উলুম মাদরাসার কিতাব বিভাগে।
এদিকে মইলাকান্দা ইউনিয়নের পূর্ব কাউরাট গ্রামের মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিনের ছেলে জোবায়ের আহমেদ (২১) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি শম্ভুগঞ্জ বাজারে মোবাইল অ্যাক্সেসরিজের ব্যবসায়ী ছিলেন।
তিন তরুণে মৃত্যুতে তখনকার সময় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না করায় গৌরীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: শফিকুল আলম ২২ জুলাই থানায় একটি মামলা করেন। অজ্ঞাত পরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলার ধারায় সেটি নথিভুক্ত হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গৌরীপুর শাখার সমন্বয়ক অর্পিতা কবির জানান, এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় কিভাবে একটি যৌক্তিক আন্দোলনকে দমন করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ তিন নিষ্পাপ শিক্ষার্থীর জীবন অকালে ঝরে যায়। আমাদের এই আন্দোলন থেকে হারিয়া যাওয়া তিনটি খুনের বিচার না হওয়া পর্যন্ত জুলাই শেষ হবে না।









