ফেনীতে জুলাইয়ের মায়েরা শীর্ষক অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২ আগস্ট) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যাকারীদের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদদের মায়েরা।
মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম। এছাড়া বিশেষ অতিথি ছিলেন সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম, জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের উপপরিচালক নাসরীন আক্তার।
স্বাগত বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফাতিমা সুলতানা। এছাড়া বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট জামাল উদ্দিন, এবিপার্টির আহ্বায়ক মাস্টার শহীদ উল্লাহ, গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব মুহাম্মদ রেজাউল করিম সুজন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম-সম্পাদক আজিজ উল্লাহ আহমদী, আহত জুলাই যোদ্ধা প্রিন্স মাহমুদ আজিম।
উপপরিচালক নাসরীন আক্তার বলেছেন, ‘মায়েরা সন্তানরা অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। প্রিয় সন্তানকে রাস্তায় পাঠিয়েছে। অনেকে রাস্তায় নেমে এসে খাবার দিয়েছে। এই অবদান অবিস্মরণীয়। শূন্যস্থান কখনো পূরণ হবার নয়। তাদের প্রত্যাশা পূরণ হলেই আত্মার শান্তি পাবে।’
শহীদ জাকির হোসেন সাকিবের মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘ছেলের কথা মনে পড়লে কলিজা ছিঁড়ে যায়। এর বেশি বলা যাবে না।’
শহীদ সাইদুল ইসলাম শাহীর মা রাহেলা বেগম বলেন, ‘আমি এক হতভাগা মা। গত বছরের ৪ আগস্ট সন্ত্রাসীদের গুলিতে আমার ছেলেকে হারিয়েছে। ২৫ টাকা ভাড়া নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। এই আন্দোলন বাংলাদেশ মুক্তির আন্দোলন। এটা বলেই ঘর থেকে বের হয়। সবসময় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সরব থাকতে হয়েছে। আগামীতে কোন ফ্যাসিবাদ তৈরি হলে আবু সাইদ, মুগ্ধ, শাহীদের মতো হাজারো বীর যোদ্ধা তৈরি হবে।’
শহীদ ওয়াকিল আহমেদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বলেন, ‘৪ আগস্ট আন্দোলনে শিহাব তিনটা গুলি খায়। সবসময় নামাজ পড়তো। অনেক ধার্মিক ছিল। আন্দোলনে যোগ দেয়ার বিষয়টা বলেও নাই। ৩ আগস্ট রাতে ছেলের সাথে অনেক কথা হয়। পরদিন বন্ধুর সাথে কথা বলে আন্দোলনে চলে যায়। আমি রাস্তা-বাড়িতে পায়চারি করি। তখন একটা ফোন পাই শিহাব হাসপাতালে। পরে তার লাশ পাই।হত্যাকারীদের যেন বিচার হয় সেটাই এখন চাওয়া।’
শহীদ সরোয়ার জাহান মাসুদের মা বিবি কুলসুম বলেন, ‘ছেলেকে বারবার বুঝানো হয়ে আন্দোলনে যেওনা। জুনের ৩০ তারিখ তার আব্বু বাড়ি আসে। ছেলে চুওি চুপি আন্দোলনে যায়। বাড়ি ফেরার পর জিজ্ঞেস করলে নানা বাহানা দিতো। ৩ আগস্ট আন্দোলনে যাওয়ার পর বাড়ি ফিরে আবু সাঈদকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়। ৪ আগস্ট ফজরের নামাজের পর ঘরে হাঁটাহাঁটি করে চা গরম করে খায়। মহিপালে আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের পানি খাওয়ায়। আন্দোলনের মাঝে চাচিকে ফোনে বলেছিল তার বাসায় যাবে। ২টা বাজে শুনি গুলি খাইছে। ছোট ছেলে ফ্লাইওভারের উপর থেকে ছবি তুলছিল। সামি ফোন পেয়ে নিচে নামার পর দেখে বড় ভাই মাসুদ মারা গেছে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল থেকে লাশ বুঝিয়ে দেয়। ৫ মিনিটের মধ্যে লাশ দাফন করতে বলা হয়। এলাকার লোকজন কেউ ঘুমায় নাই। এত পাহারার মধ্যেও ৪০০ মানুষ জানাজায় অংশ নেয়। এখন রাতে ঘুমাতে পারি না। তার কত বন্ধু। সব উৎসব মাটি হয়ে গেছে। সন্তানদের রক্তের জবাব সবাইকে দিতে হবে। সন্তানদের নিয়ে এখন কত তালবাহানা চলছে। দ্বিতীয়বার কোন ফ্যাসিবাদ যেন জন্ম নিতে না পারে।’
শহীদ ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবনের মা ফাতেমা আক্তার, ‘শ্রাবন দেশের জন্য ভাবত। ৪ আগস্ট প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। সুতির ওড়না নিয়ে ৩ আগস্ট জোহরের নামাজ পড়ে বের হয়। সালাম করে দোয়া নিয়ে বের হয়। ওই দিন তার মাথায় শেষ হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম। বাসয় ফেরার পর তার মধ্যে ভীষণ উত্তেজনা কাজ করছিল। অনেক রাজনৈতিক দল আছে শহীদ পরিবারদোর সম্মান দিতে কষ্ট হয়। মানুষ ভাবে আমরা আবেগ দেখাতে আসি। আবেগ দেখানোর প্রয়োজন। আমাদের কষ্ট আমরা মায়েরা বুঝি। ভয়ঙ্কর দিনের কষ্ট কেউ বুঝবে না। জালিমরা গোসল করানোর সময় ইমামকে বলতেছে কয়টা গুলি খেয়েছে সেটা বলবে না। তার শরীরে যেখানে হাত দিই সেখানেই রক্তাক্ত। কোনো দলের জন্য আন্দোলনে যায়নি। তবু কিছু মানুষ চেয়ার পায়। তাদের হত্যার বিচারের জন্য, জুলাই সনদের জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হয়। সুবিচার আল্লাহ করবেন। ইত্যাদি হোটেলের সামনে দুটা গুলি লাগার পর দৌড়ে পাসপোর্ট অফিসের সামনে গিয়ে পড়ে যায়। সেখানে আরো চারটা গুলি লাগে।’
আলাল বলেন, ‘ফেনীতে যেসব মায়েদের সন্তানরা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। প্রতিটি মা জানে সন্তান হারানোর কষ্ট। এটা মা ছাড়া আর কেউ কেউ কষ্ট বুঝবেনা। জুলাই কোন্দ্রীক যে নির্মমতা হয়েছে তাদের ভুলতে বসেছি। সেদিন চিকিৎসা নিতে পারেনি। দাফনে দুই তিনজন লোক ছাড়া অংশ নিতে পারেনি। ফেনীর হত্যা ও পরবর্তী সময় হিটলারের ফ্যাসিবাদের সাথে তুলনা হতে পারে। জুলাই এর সাথে কোনো আপস নাই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতে পারে। আগামী প্রজন্মকে জুলাই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। আবার পলায়নকারীরা আসার চিন্তা করলে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’
এ সময় সভায় চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। শেষে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়।









