কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গত বছরের এই দিনে (২০ জুলাই) ঢাকার সাভারে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন রাজবাড়ীর কালুখালীর কুরমান শেখ। ওইদিন কারফিউ চলাকালে সাভারের মাছ বাজার এলাকায় প্রাণ হারান শারীরিক প্রতিবন্ধী মুরগি ব্যবসায়ী কুরমান শেখ।
কুরমানের মেয়ে মিতু বলেন, ‘আমার বাবা প্রতিবন্ধী ছিলেন। হাঁটতেও পারতেন না ঠিকমতো। তারপরও তাকে কেন গুলি করা হলো? আমরা শুধু তার হত্যার বিচার চাই। আর চাই আমাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।’
ছেলে রমজান শেখ বলেন, ‘আব্বু কারো ক্ষতি করেননি, কোনো মিছিল-মিটিংয়েও ছিলেন না। তারপরও কেন তাকে মেরে ফেলা হলো—এর কোনো উত্তর আমরা পাইনি। আজও বিচার হয়নি।’
স্ত্রী শিল্পী খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পুলিশের কাছে আমার স্বামী প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন। হাতজোড় করেছিলেন। তবু তাকে রেহাই দেয়া হয়নি। আমার সন্তানদের পড়ালেখা কে করাবে এখন? কে দেখবে ওদের স্বপ্ন?’
এক বছর পেরিয়ে গেলেও কুরমান শেখের পরিবার এখনো পায়নি বিচার, পায়নি কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তা বা সহমর্মিতা। একজন নিরপরাধ, শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ কিভাবে রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে নিহত হয়—তার জ্বলন্ত উদাহরণ কুরমান শেখ।
এই দিবসে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে পরিবার ও এলাকাবাসী কুরমান শেখ হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং তার পরিবারের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।
রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব রতনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন কুরমান শেখ। বয়স ছিল ৪৯ বছর। জানা গেছে, তিনি ছিলেন নিরীহ একজন মানুষ—রাজনীতির সাথে যার ছিল না কোনো সম্পৃক্ততা। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে চলছিল তার ছোট্ট সংসার। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
ছেলে রমজান শেখ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র এবং মেয়ে মিতু আক্তার ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ প্রথম বর্ষে পড়ছে। তাদের স্বপ্ন ছিল বাবার হাত ধরেই এগিয়ে যাওয়ার—রমজান বিসিএস ক্যাডার হবে, মিতু ব্যাংকার। কিন্তু সেই স্বপ্নে ছেদ পড়ে ঠিক এক বছর আগে, পুলিশের গুলিতে কুরমান শেখ প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়ে।
ঢাকায় কোটা সংস্কার ঘিরে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঘটনার দিন সকাল থেকেই পরিস্থিতি ছিল থমথমে। কারফিউয়ের মধ্যেই দোকানপাট খুলেন অনেকে। কুরমান শেখও দোকানে যান। দুপুর ১টার দিকে শুরু হয় গুলি। ভীত কুরমান মাছ বাজারের বরফকলের গেট বন্ধ করে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেই আশ্রয়স্থলেই গেট ভেঙে ঢুকে শুরু করে নির্বিচার গুলিবর্ষণ। গুলি লাগে কুরমান শেখের বুকে ও পায়ে। ছররা গুলি বিদ্ধ হয় মুখ ও বুকে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।









