জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘একটি বড় দল রয়েছে যারা লক্ষ-কোটি মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। আমাদের ওইসব ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। আওয়ামী লীগের সরকারেরও লক্ষ-কোটি লোক ছিল। কিন্তু আমরা কয়েকজন যখন গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে নেমেছিলাম, তখন আবাবিল পাখির মতো মানুষ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। প্রয়োজনে আবারো রাজপথে নামবো।’
শুক্রবার (১১ জুলাই) জুমার নামাজের পর ‘জুলাই পদযাত্রা’ শেষে যশোর শহরের ঈদগাহ মোড়ে অনুষ্ঠিত পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘কাউকে ছাড় দেবেন না। আমরা যশোরে আর চাঁদাবাজি দেখতে চাই না। আপনার এলাকার চলমান চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আপনাদের সরব হতে হবে। এমনকি এনসিপির মধ্যেও যদি কোনো চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী থেকে থাকেন তারাও সাবধান হয়ে যান। দল-মত নির্বিশেষে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও সরব হতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে এর আগে যেই দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা সরকারি বাহিনী ও আমলাদের দলীয়করণ করেছে। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানই নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী হতে দেয়া যাবে না। তাদের খুন-গুমের সাথে যুক্ত করে কলঙ্কিত হতে দেয়া যাবে না। এসব নিয়েই কাজ করছে এনসিপি।’
এ দেশের নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি তারা পরিবর্তিত না হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমরা ইনসাফভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলে দেশে সংস্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ হাসপাতালের অবস্থা নাজুক। আজ অবধি আইসিইউ ব্যবস্থা চালু হয়নি। কিছু হলেই মানুষকে খুলনা বা ঢাকায় দৌড়াতে হয়।’
‘ভবদহ অঞ্চলের মানুষের কষ্টের কথা কারা জানে? সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার কিংবা বেনাপোলের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়েও আমরা অবগত। এসব সমস্যা সমাধানে এনসিপি কাজ করছে।’
তিনি সবাইকে এনসিপির পাশে থাকার আহ্বান জানান।
সংগঠনের সদস্য সচিব আকতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে যখনই আন্দোলন হয়, তখন ছাত্ররাই জীবন দেয়, রক্ত দেয়; আর কিছু রাজনৈতিক দল ফায়দা লুটে। এবারো আন্দোলন হলো। ওরা ভেবেছিল, আন্দোলনের পর আমরা ঘরে ফিরে যাব। কিন্তু আমরা রাজপথেই রইলাম। তখনই তাদের মধ্যে ভয় ঢুকে যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনীতিতে এসেছি, শাপলা প্রতীক চেয়েছি। তাতেই তাদের গা জ্বলছে। এখনো হাসিনার দোসররা সক্রিয়। সংস্কার সবার আগে দরকার। আমরা এখনো আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত। আসুন, আলোচনায় বসুন, না হলে আমাদের আবার রাজপথে নামতে বাধ্য করবেন। যেমনটা জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘শেখ হাসিনা বলেছিলেন ভারতকে যা দিয়েছি, তা আজীবন মনে রাখবে। ভারত ঠিকই মনে রেখেছে, তাই তো তাকে আশ্রয় দিয়েছে। আমরা ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু তাদের দাদাগিরি মেনে নেব না।’
তিনি শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠাতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানান।
সমাবেশে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমরা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কথা বললে একটি দল রাগ করে। আমরা টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে কথা বললে আরেকটি দল রাগ করে। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি বলেই একদল ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘একটি দল ভারতে পালিয়েছে, আরেকটি দল পালিয়েছে লন্ডনে। তারা বিদেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ওই দল আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এনসিপিকে নির্বাচনের বাইরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। যদি কেউ আমাদের সংস্কার কার্যক্রমে বাধা দেয়, তাহলে ধরে নেব তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, “আমরা সংস্কার চাই, বিচার চাই, নির্বাচনও চাই। কিন্তু একটি দল শুধুই ‘নির্বাচন, নির্বাচন’ করে। সংস্কার কিংবা বিচারের কথা বললেই রেগে যায়। কারণ তারা এসব চায় না।”
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে যশোর প্রথম স্বাধীন হয়েছে। তাই এই যশোর থেকেই সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের নেতৃত্ব দিতে হবে।’
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি—সময় এসেছে মানুষের ন্যায্য বিচার, সংস্কার ও দেশ পুনর্গঠনের জন্য সবাইকে এক হওয়ার। যশোরে আমরা আর কোনো চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দেখতে চাই না।’
তিনি সকলকে এনসিপির পাশে থাকার আহ্বান জানান।
পথসভায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে হাজির হন। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ঈদগাহ ময়দান।
সকালে জুলাই আন্দোলনের আহত ও শহীদ পরিবারের সাথে মতবিনিময় সভা করে এনসিপি। পরে মুজিব সড়কের মডেল মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এসময় মসজিদে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। নামাজ শেষে পদযাত্রা শুরু হয়।
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা, সামান্তা শারমিন, আতাউল্লাহসহ যশোর ও আশপাশ জেলার নেতৃবৃন্দ।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সংগঠক সাকিব শাহরিয়ার, কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াহিয়া জিসান, খালিদ সাইফুল্লাহ জুয়েল, সাজিদ সরোয়ার, নুরুজ্জামান প্রমুখ।









