বিগত ৪ বছর আগে সিন্ডিকেটের অভিযোগে মালয়েশিয়ার সাবেক মাহাথির সরকার কলিং ভিসা স্থগিত করার পর একের পর এক জটিলতায় ঝুলে আছে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজারটি। কলিং খুলে শ্রমবাজার স্বাভাবিককরণে এই ৪ বছরে অসংখ্য মেইল-মিটিং ও দেন-দরবার হয়েছে। কিন্তু ফলাফল যেই লাউ সেই কদু।

এ অচলাবস্থা চলতে থাকলে কলিং যেমন বন্ধ হয়ে যেতে পারে আবার চালু হলেও আগের মতই মহাসংকটে পড়তে পারে কলিং ভিসায় বাংলাদেশী কর্মী নেয়া।

যেভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল ২০০৭-এ চালু হওয়া কলিং ভিসার, তেমনিভাবে অবৈধ হয়ে মানবিক সংকট পড়তে পারেন সাধারণ কর্মীরা। কলিং নিয়ে উভয় দেশ এক কদম এগিয়ে আসলে আবার নতুন জটিলতায় ২ কদম পিছিয়ে যায়।

সিন্ডিকেট নিয়ে বাংলাদেশের তীব্র আপত্তিতে যেমন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম সারাভানা কোনো কর্নপাত করছেন না, ঠিক তেমনি মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের সিন্ডিকেট বিরোধী বক্তব্যকেও তিনি পাত্তা দিচ্ছেন না।

মাহাথির সরকারের পর ২ দফায় দেশটির সরকারের পালাবদল হয়েছে। সারাভানান ক্ষমতায় আসার পর দফায় দফায় কলিং বিষয়ে নিজ দেশেই তীব্র সমালোচনা ও তোপের মুখে পড়ছেন।

দেশটির এনজিও, মানবাধিকার সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনার কবলে পড়ছেন। তাদের প্রশ্ন, বাংলাদেশ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ১৫২০ এজেন্সি থেকে শ্রমিক আমদানি না করে কেন শুধু ২৫ এজেন্সি থেকে শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে?

তবে এত আলোচনা-সমালোচনার পরও নিজের অবস্থানে অনড় সারাভানান। সর্বশেষ গতকাল সোমবার দেশটির অন্যতম রাজ্য সাবাহ-এর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হ্যারিস সালেহ এক বিবৃতিতে বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণকে একটি ‘মূর্খ ধারণা’ বলার জন্য এম সারাভানানের পদত্যাগ করা উচিত।

গত সপ্তাহে দেশটির শিল্প কারখানার মন্ত্রী জুরাইদা কামরান বাংলাদেশ থেকে কলিং ভিসায় শ্রমিক না নিয়ে পাকিস্তান থেকে শ্রমিক নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

মাসখানেক আগেও কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে দেশটির এনজিও সংস্থাগুলো সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিলে নিজ দেশের লোকজন কাজ পাবে না। কিন্তু এনজিওর দাবি অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। কারণ পাম তেল ও কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে শ্রমিকের অভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এসব সেক্টরে শুধুমাত্র অভিবাসী শ্রমিকরা কাজ করে। মালয়েশিয়ানরা এসব সেক্টরে কাজ করতে পারে না।

বাংলাদেশের ২ জুন জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ের আগে অর্থাৎ ঢাকায় যাওয়ার আগে সারাভানান হুমকি দিয়েছিলেন, যদি ঢাকায় তার সামনে বিক্ষোভ করে তাহলে এজেন্সির সংখ্যা আরো কমিয়ে দেয়া হবে। পরে সিন্ডিকেট বিরোধীরা একটি মানববন্ধন করেছেন।

গত রোববার (১৯ জুন) এম সারাভানান ২৫টি এজেন্সি বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাবে মর্মে একটি বিবৃতি বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ওই ২৫ এজেন্সি নিয়োগ দেবে আরো ২৫০ সাব-এজেন্সি। এই ২৫০ এজেন্সি ২৫ এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাবে। প্রথমে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে সিন্ডিকেটের বিরোধিতা করলেও এখন নীরব। কারণ সারাভানান সাফ জানিয়ে দিলেন, কোন কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে সেটা নির্ধারণ করবে আমার দেশের নিয়োগকর্তা। যদিও ২৫ এজেন্সি নির্বাচনে সারাভানান নিয়োগকর্তাদের মতামত নেননি।

কলিং ভিসায় মোট খরচ কত পড়বে সেটা এখনো অজানা। এদিকে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ বার বার বলছেন, খরচ ১ লাখ ৬০-এর বেশি হবে না। কিন্তু মন্ত্রীর এই খরচের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। কারণ আগের কলিং ভিসায় ৪০ হাজার টাকা খরচ সরকারিভাবে নির্ধারণ করলেও একজন কর্মীকে গুনতে হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। খোদ মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা বলছেন করোনা মহামারীর কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে এই মুহূর্তে ভর্তুকি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মী আমদানি সম্ভব নয়।

তারা বলছেন, বিমান টিকিট ও অভিবাসন ব্যয় আমাদের বহন করা সম্ভব না। তবে মালয়েশিয়াতে শ্রমবাজারের সংশ্লিষ্ট সকলেই বলছেন, সিন্ডিকেট হলে আগের থেকেও বেশি খরচ পড়বে শ্রমিকদের। আনুমানিক প্রায় ৪ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর এই খরচ তুলতে গিয়েই শ্রমিকেরা আগের মত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অবৈধ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি নিয়োগকর্তাদের একটি সংগঠন কুয়ালালামপুরের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, আমরা ২৫ কিংবা ২৫০ এজেন্সির মাধ্যমে নয় বাংলাদেশের সব বৈধ এজেন্সি থেকে কর্মী আমদানি করতে চাই।

তাদের যুক্তি হলো, ২০০৭-৮ সালে চালু হওয়া কলিং ভিসায় ১০ সিন্ডিকেট এর মাধ্যমে কর্মী প্রতি সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। যার ফলে একজন কর্মী মালয়েশিয়া এসে দেখে তার কোম্পানিতে সব কর্মীর কাজ নেই। আবার কাজ থাকলেও বেতন এতই কম যে, খরচের সাড়ে ৩ লাখ টাকা সাড়ে ৩ বছরেও উসূল করা সম্ভব না।

তখন বাধ্য হয়ে পালিয়ে গিয়ে অবৈধ হয়ে অন্য কোম্পানিতে কাজ করে অথবা বাধ্য হয়ে নিজ দেশে ফিরে গেছে। এতে করে সরকার ও কর্মী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু লাভবান থেকে যায় মধ্যস্বত্তভোগী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো।