বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) তাপসী রাবেয়া হলে কৃষি অনুষদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনোভা হককে গভীর রাতে ডেকে নিয়ে র্যাগিংয়ের দায়ে তিনজনকে বহিষ্কারসহ পাঁচ নারী শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মো: হেলাল উদ্দীনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অর্ডিন্যান্স ফর স্টুডেন্ট ডিসিপ্লিন’ এর ৭ নম্বর ধারা অনুসারে অভিযুক্ত তিনজনকে সাময়িকভাবে হল থেকে বহিষ্কার। হল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃতদের মধ্যে কৃষি অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মারিয়া সুলতানা মীমকে ১২ মাসের জন্য এবং একই অনুষদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জোবায়দা জান্নাত সোহা ও আশিকা রুশদাকে ছয় মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এছাড়াও প্রভোস্টের আওতাধীন শাস্তি অনুসারে কৃষি অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষ ও প্রথম বর্ষের দুইজনকে এক হাজার টাকা করে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।
শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা জানান, প্রশাসন দুই পক্ষকে একসাথে বসায় নাই। ওই মেয়ে (ভিক্টিম) অনেক অভিযোগ আমাদের নামে দিয়েছে যার কোনো প্রমাণ নেই। আমরা মানছি যে রাতে বসাটা আমাদের ভুল ছিল তবে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন ও ফোন কেড়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেনি।
শাস্তিপ্রাপ্ত দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, ‘ঘটনার শুরু ১৯ মে দিবাগত রাত ২টার দিকে আমি আমার রুমে পড়তে ছিলাম তখন তার (ভিক্টিম) একজন সহপাঠী আমাকে এসে জানায় যে, সে (ভিক্টিম) আমার নামে খারাপ কথা বলে বেড়িয়েছে। এরপরে আমিও আমার একজন সহপাঠী এবং ভিক্টিম ও তার আরো তিনজন সহপাঠী মিলে আমরা গেস্টরুমের পাশে একটা জায়গায় বসেছিলাম। আমরা তখন ছাদে ছিলাম তাই তিনজন জুনিয়রের একজন তাকে ছাদে আসতে বলে বিষয়টি সমাধানের জন্য। পরে সে ছাদে আসতে চায়নি তাই আমরা গেস্টরুমের পাশে একটা জায়গায় বসেছিলাম। যেখানে সিসিটিভিতে সব দেখা যায়। আমরা তার প্রতি কোনো শারিরীক নির্যাতন করিনি, তার ফোনও কেড়ে নেয়া হয়নি। তবে সেদিন এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের মতো আমাদের আলোচনা চলে। পুরো ঘটনা সিসিটিভি রেকর্ড আছে। ওই মেয়ে সেদিন দোষ স্বীকারোও করেছে এবং পরের দিন বাসায় চলে যায় এখানো আসেনি।’
এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- কোনো শারিরীক নির্যাতন তো এখানে নাই তাহলে এতো বড় শাস্তি কেন? ভিক্টিমের বয়ানে অনেকগুলো ভুল ও মিথ্যা কথা বলেছে আমরা যেগুলো প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটর ম্যামদের সাথে বসার সময় প্রমাণ করেছি। ম্যামরা বায়াসড ছিল। ম্যামরা আমাদের চরিত্র নিয়ে অনেক কথা বলেছে। প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটর মিলে আমাদের পাঁচজনকে বলেছে আমাদের নাকি মেয়ে ঘটিত সমস্যা আছে। প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটর ম্যাম পরীক্ষার আগে রাত ১১টা বা সাড়ে ১১টার দিকে আমাদের ডেকে জেরা করে, বয়ান না পড়িয়ে স্বাক্ষর নেয়।’
তিনি আরো জানান, ২৭ মে ম্যামরা আমাদের একে একে ডাকেন। আমাদের বয়ান নিয়ে আমাদের পড়তে না দিয়েই আমাদের স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। আমরা বলেছিলাম তার ওপর কোনো টর্চার করা হয়েছে কি না, সেখানে সিসিটিভি আছে, ভিডিও আছে সেটা দেখে ব্যবস্থা নেন। হল প্রশাসন আমাদের কোনো কথা শুনেনি। ম্যামরা জোর পূর্বক আমাদের স্বীকার করিয়ে নেয় একপ্রকার। হলের ম্যামরা আমাদেরকে তিনটা শর্ত দেয় পরে আমরা এই বিষয় প্রক্টর স্যারকে জানিয়েছিলাম, পরে এটা নিয়ে আরো আলোচনা হয়। এরপরে আমাদেরকে আর কিছু বলে নাই তারপর হুট করে আজকে এই নোটিশটা আসলো।
এ বিষয়ে বাকৃবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো: আবদুল আলীম বলেন, ‘তদন্ত কমিটি হয়েছিল, হল প্রশাসন তদন্ত করেছে। আমরা প্রক্টর বডি থেকেও কয়েকবার সেখানে গিয়েছি। দুইপক্ষ থেকেই লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল। প্রত্যেককে প্রশ্ন করে করে, হল প্রশাসন থেকে তদন্ত করে তারা রিপোর্ট দাখিল করেছে। ওই মেয়ে (ভিক্টিম) ঘটনার পরের দিন খুব ভোরেই তার পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি চলে যায় এবং বাসা থেকেই অভিযোগ দেয়। পরে হল প্রশাসন তাকে ডেকে এনে তার থেকে বিস্তারিত শুনে।’
এই বিষয়ে ওই হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলী বলেন, ‘এটা হলের অভ্যন্তরীণ হল প্রশাসন তদন্ত করেছে, প্রক্টর স্যার, ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা স্যার সকলেই বিষয়টা জানেন। তদন্ত কমিটিতে আমার হলের তিনজন হাউজ টিউটর ও আমি ছিলাম। শাস্তির বিষয় অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ভিসি স্যারের সাথে মিটিং করে দেয়া হয়েছে। ওরা বলছে র্যাগিং করিনি তাইলে রাত ১টা ৪৫ থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত পাঁচজন মিলে একটা মেয়েকে মানসিক নির্যাতন করেছে। ওই ভিক্টিম মেয়েটা দুর্বল হৃদয়ের সে সেসময় বলেছিল আমি স্ট্রোক করতে পারি আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি। তখন ওই পাঁচজন নাকি বলেছে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার আগে অন্তত কিছু লক্ষণ প্রকাশ করো তখন তোমাকে দেখবো আমরা। আমরা ভিক্টিম মেয়েকে অভিভাবকসহ ডেকে এনে বক্তব্য নিয়েছি এবং অভিযুক্ত পাঁচজনকে ধাপে ধাপে ডেকে বক্তব্য নিয়েছি। পাঁচজনের মধ্যে একজনকে এক বছরের জন্য, দুইজনকে ছয়মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং বাকি দুইজনকে এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।’
এরমধ্যে শাস্তিপ্রাপ্ত তিনজন ভিক্টিমের সহপাঠী এ বিষয়ে প্রভোস্ট বলেন, ‘ঘটানাটা তো ঘটেছে তারা এরসাথে জড়িত ছিল। এজন্য তারা শাস্তি পেয়েছে।’








