শাহেদ মতিউর রহামন

রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ে নাজমুল। বাবা-মা উভয়েই সচেতন অভিভাবক; কিন্তু নাজমুল পড়াশোনায় খারাপ না হলেও স্কুলের প্রতি তার চরম অনীহা। স্কুল থেকেও কিছু দিন পরপরই নোটিশ আসে নাজমুলের অনুপস্থিতির বিষয়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শুধু নাজমুল একাই নয়, তার ক্লাসের আরো অনেক শিক্ষার্থীই স্কুলে নিয়মিত ক্লাসে আসে না। তবে স্কুলের বাইরের কোচিং বা টিউশনে তারা সবাই সুবোধ। আর এ ক্ষেত্রে মেয়েরা আনুপাতিক হারে স্কুলে উপস্থিত থাকে বেশি। এটা শুধু ঢাকার একটি মাত্র স্কুলের চিত্র নয়, ঢাকা কিংবা জেলা-উপজেলাপর্যায়ের অনেক স্কুলেও উপস্থিতির ক্ষেত্রে এই একই চিত্র।  ক্লাসরুমে কমে যাচ্ছে উপস্থিতি। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। আর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পাঠদান কৌশলে পরিবর্তন এবং নজরদারি বাড়ানোরও তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা ।  করোনা-পরিবর্তী সময়ে গত চার বছরের বিভিন্ন জরিপও বলছে গ্রামে কিংবা শহরে অধিকাংশ স্কুলেই কমে গেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতি। সূত্রগুলো বলছে, বিদ্যালয়ে ভর্তি আছে; কিন্তু নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে আসছে না অনেক শিক্ষার্থী। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে পড়ছে। উপস্থিতির এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবাই। তাদের আশঙ্কা, নিয়মিত বিদ্যালয়ে না গেলে শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি বাড়বে এবং একপর্যায়ে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ দিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অহহঁধষ চৎরসধৎু ঝপযড়ড়ষ ঝঃধঃরংঃরপং (অচঝঝ) ২০২৪ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক উপস্থিতির হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে এ হার ছিল ৮৮ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৮৮ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে উপস্থিতি কমেছে। একই সময়ে অনুপস্থিতির হার বেড়ে হয়েছে ১২.৫৫ শতাংশ।
ভর্তি আছে, শ্রেণিকক্ষে নেই
সূত্র বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর এই অনুপস্থিতির সংখ্যা এখনো বড়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ওচঊগওঝ-এর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, সিস্টেমে প্রায় এক কোটি তিন লাখ শিক্ষার্থী যুক্ত রয়েছে; কিন্তু শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি করানোই শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি নয়- নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকা এবং শেখার সুযোগ পাওয়া আরো গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও শেখার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি খসড়া শিক্ষা পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই দশকে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিত শেখার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলে শুধু উপস্থিতির খাতায় নাম থাকা দিয়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
কেন কমছে উপস্থিতি?
শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে পারিবারিক আর্থিক চাপ, শিশুশ্রম, বাড়ির কাজে সহায়তা, অভিভাবকের অসচেতনতা এবং বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে সিপিডির গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ভর্তি ৭ শতাংশ কমেছে। মাধ্যমিক পর্যায়েও শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষণায় শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য দিকে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পাঠদানের মানও শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। কোথাও নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, শিক্ষক সঙ্কট, দুর্বল অবকাঠামো, পাঠদান আকর্ষণীয় না হওয়া কিংবা পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার চাপ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়বিমুখ করতে পারে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে
শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না গেলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয় অভিভাবকদের মধ্যে। কারণ সন্তান বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না- এটি নিশ্চিত করা গেলেও শ্রেণিকক্ষে সে আদৌ নিয়মিত অংশ নিচ্ছে কি না, তা অনেক অভিভাবকের পক্ষে জানা কঠিন। শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী ২০২৫ সালের এক আলোচনায় শিক্ষাক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, শিক্ষক ও ভালো পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি অভিভাবকের উৎসাহও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। অভিভাবকদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো- একবার নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীকে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল; দীর্ঘ সময় বই না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
উপস্থিতি কমলে যে ঝুঁকি
শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর শেখার ওপর। নিয়মিত ক্লাস না করলে একটি অধ্যায়ের সাথে পরবর্তী অধ্যায়ের সংযোগ হারিয়ে যায়। দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরো পিছিয়ে পড়ে। পরে পরীক্ষার আগে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। একটি গবেষণাভিত্তিক আলোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত টিউশনের ওপর নির্ভরশীল। এতে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীর শেখার মধ্যে ব্যবধান আরো স্পষ্ট হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনিয়মিত উপস্থিতির পরিণতি আরো গুরুতর হতে পারে। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি- এ ঘটনাকে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার বড় সতর্কসঙ্কেত হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে শিক্ষার্থী উপস্থিতি শুধু বিদ্যালয়ের রেজিস্টারে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত বিশ্লেষণ করা দরকার। কোন শ্রেণীতে উপস্থিতি কম, কোন এলাকায় কম, কোন শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে অনুপস্থিত- এসব তথ্য ধরে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ওচঊগওঝ ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর তথ্য ডিজিটাল-ব্যবস্থায় যুক্ত করেছে। এই তথ্যব্যবস্থাকে শুধু পরিসংখ্যান সংরক্ষণের কাজে না রেখে অনুপস্থিত শিক্ষার্থী শনাক্ত, অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা হওয়ার ঘটনা তাই শুধু উপস্থিতির সমস্যা নয়; এটি শিক্ষার মান, শিখনফল এবং ভবিষ্যৎ ঝরে পড়ার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ভর্তি বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আনা এবং শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অভিভাবক, শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি ছাড়া এ সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদে আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।