মনিরুল ইসলাম রোহান
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নাশকতা, ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় গ্রেফতার ও রিমান্ডের ঘটনাও সামনে এসেছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে দলীয়ভাবে কী উদ্দেশ্য কাজ করছে, লক্ষ্য কি তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসেব-নিকেশ। এ দিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর থেকেই দেশ থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন শেখ হাসিনাসহ তার সরকার ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত কয়েক হাজার নেতৃবৃন্দ। বিশেষ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার দুই বছরের মাথায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণার পরপরই নেতাকর্মীদের মধ্যে আত্মগোপনের খোলস থেকে বেরিয়ে একটা অতি উৎসাহী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নেতিবাচকতার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অপর দিকে গণহত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনার হঠাৎ দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ইন্ধন রয়েছে কি না তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যদিও পতিত দলটির নাশকতায় সংশ্লিষ্টতার আড়ালে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কয়েকটি বিষয় সামনে এনেছেন। তাদের মতে, প্রথমত, দীর্ঘদিন রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দেয়ার কৌশল হতে পারে। এর মাধ্যমে একটা বয়ান কৌশল তৈরি হবে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায়ও সংগঠনটি মাঠে সক্রিয় আছে, এই বার্তা দেয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করা। বিচ্ছিন্ন সহিংসতা বা অস্থিরতা তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়তে পারে। ভয় ও অনিশ্চয়তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে একটা আতঙ্ক তৈরি করতে পারলে এক দিকে সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে অন্য দিকে সরকারকে অস্থিতিশীল দেখাতে পারলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হলে সরকার যে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ, এমন ধারণা তৈরি করা সম্ভব হবে। তা ছাড়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হলে সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় রাখা। দীর্ঘ সময় সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা কর্মীদের মধ্যে মনোবল ধরে রাখতে ঝটিকা কর্মসূচি, প্রচার ও সঙ্ঘবদ্ধ উপস্থিতিকে ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এও বলছেন, রাজনৈতিক বয়ান পরিবর্তনের একটা চেষ্টা থাকবে। সহিংসতা ও পাল্টা দমন-পীড়নের ঘটনা সামনে এলে রাজনৈতিক বিতর্ক অর্থনীতি, জনসেবা বা নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দিকে চলে যেতে পারে। সাম্প্রতিক গুলশানের ঘটনায় পুলিশ বলছে, ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার অভিযোগে করা মামলায় ১৫ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। মামলায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আসামি করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এসব ঘটনা কি কোনো কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ, নাকি স্থানীয় পর্যায়ের কর্মীদের স্বতন্ত্র কর্মকাণ্ড? অবশ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও পতিত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরপরই তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা অতি উৎসাহী এবং চাঙাভাব তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই মনোবল ধরে রাখতে ছোট ছোট কর্মসূচি পালন করার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি এবং বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ফলে আওয়ামী লীগের জন্য এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন হলো কিভাবে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতিতে বৈধতা ও সংগঠন পুনর্গঠন করা যায়। সেই দৃষ্টিতে দেখলে নাশকতা একটি উচ্চ-ঝুঁকির কৌশল স্বল্পমেয়াদে সরকারকে বিব্রত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন আরো কঠিন করে দিতে পারে।
এ দিকে বর্তমানে নাশকতার ইন্ধনদাতা হিসেবে ভারতের অনুসমর্থনকে দায়ী করছেন এ দেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ। তাদের যুক্তি অনুযায়ী, ভারত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতায় সরাসরি সমর্থন বা অর্থ/অস্ত্র/অপারেশনাল সহায়তা দিচ্ছে- এমন নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া না গেলেও ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এগুলো বাস্তব বিষয়, ফলে ভারতের পরোক্ষ রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভারত আওয়ামী লীগের সাথে ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিল, এটি অস্বীকার করার মতো বিষয় নয়। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের সময় দিল্লি-ঢাকার নিরাপত্তা, সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্পর্ক গভীর ছিল। ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে আওয়ামী লীগকে তুলনামূলকভাবে পরিচিত ও নিরাপত্তার দিক থেকে সুবিধাজনক অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতাও ছিল। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক যোগাযোগের খবর এসেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও শেখ হাসিনার সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের আলোচনার কথা এসেছে। রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য থেকে যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে শক্তভাবে বলা যায়, তা হলো, ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের পরও তাকে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করতে দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো : ভারতের নীরবতা বা আওয়ামী লীগকে আশ্রয় দেয়া সন্দেহের কারণ হতে পারে। গত ৫ আগস্ট দিল্লির অনুষ্ঠানে হাসিনার বক্তব্য নিয়েও ঢাকা আপত্তি জানিয়েছিল। ভারত অবশ্য বলছে, ওই অনুষ্ঠানে সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং হাসিনার বক্তব্য তারা অনুমোদন করে না। যদিও বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এটিকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার বিষয় হিসেবে দেখছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, এ দেশে ভারতের একমাত্র সোল এজেন্ট হলো আওয়ামী লীগ। কিন্তু এ দেশের আপামর জনসাধারণ আওয়ামী লীগকে বিতাড়িত করার ফলে তারা একটু বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে। কূটনৈতিক সম্পর্কও ভালো যাচ্ছে না। এ জন্য ভারত মনে প্রাণে চাইবে যেকোনো উপায়ে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার যে ঘোষণা দিয়েছেন তা জেনেবুঝেই দিয়েছেন, এতে আমি মনে করি, প্রতিবেশী দেশ ভারতেরও অনুসমর্থন রয়েছে। এটা একটা রাজনৈতিক কৌশল। কেননা তাদের ভুখণ্ডে থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, বিভিন্ন হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। আর এতে উৎসাহিত হয়ে এ দেশে থাকা তাদের নেতাকর্মীরা দেশে একটা অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। দেশে বর্তমানে এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির নেপথ্যে ভারতের ভূমিকাও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।





