কূটনৈতিক প্রতিবেদক
মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সিদ্ধান্ত নেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। আমরা বুঝতে পারছি, বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের বৈরিতার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আশা করছি, এই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে। তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আরো ভালো সম্পর্ক দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক উন্নয়নকে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহ দেয়।
নিউ ইয়র্কে এক ব্রিফিংয়ে য্ক্তুরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প প্রশাসনের এ অবস্থান তুলে ধরেছেন। নিউ ইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে ‘একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম দক্ষিণ এশিয়ার সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি’ বিষয়ক এই ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকরা ছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহারসহ নৃশংসতার নির্দেশ দেয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন হাসিনা; কিন্তু তার আগে তিনি নিরাপত্তা এবং নিজের অনুপস্থিতিতে চলা বিচার চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ চেয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে বাংলাদেশের সাথে, বিএনপির সাথে আমাদের সম্পর্ক খুবই চমৎকার। আমরা নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ চালিয়ে যেতে চাই। বাংলাদেশকে আরো শক্তিশালী ও নিরাপদ করার যে কাজ চলছে, আমরা তার পাশে রয়েছি। বাংলাদেশকে আরো সমৃদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কার্পণ্য নেই।
আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারটি এক সাংবাদিক নির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারকেই নিতে হবে।
অপর এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সাথে বাংলাদেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে না নিয়ে কিভাবে সবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব? জবাবে কর্মকর্তাটি বলেন, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি জটিল অংশে পড়েছে। তবে বাংলাদেশকে কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে ওয়াশিংটন বাধ্য করতে চায় না। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও টেলিযোগাযোগের মতো স্পর্শকাতর খাতে বাংলাদেশকে সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব ব্যবস্থাগুলো সুরক্ষায় সহায়তা করতে এবং বিকল্প ব্যবস্থা দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেন, আমরা বলছি না যে বাংলাদেশকে এটি বা সেটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে। আমরা বরং বাংলাদেশের স্পর্শকাতর খাতগুলোর জন্য বিকল্প দিতে চাই।
ব্রিফিংয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া সম্পর্কিত উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিথানী মরিসন দক্ষিণ এশিয়ায় বিরাজমান পরিস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির আলোকে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বাণিজ্যিক সহযোগিতা, অ্যাভিয়েশন খাত এবং বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন।
মরিসন বলেন, চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছেন। এটি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বোয়িং কেনা সংক্রান্ত বাংলাদেশের সাথে একটি বড় বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে এটিকে স্বাগত জানিয়ে একটি পোস্টও দিয়েছেন।
বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই : বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে।
নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর স্থানীয় সময় ২৫ সেপ্টেম্বর চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির অর্থনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিটির উদ্দেশ্য ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রযুক্তিগত বিনিময়, পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং বেসামরিক জ্বালানি খাতে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।





