বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম

বৈরী আবহাওয়াতে থমকে যায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বোদ্দা মহলে। সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি স্থানান্তরে বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও ইতঃপূর্বে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় ছাড়া এ ধরনের প্রসঙ্গ আসেনি। তা ছাড়া এলএনজি এফএসআরইউগুলো অল ওয়েদার প্রোটেক্টেড অপারেশনাল ইউনিট। ফলে নতুন এই তত্ত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে সন্দেহ দানা বাঁধছে। একই সাথে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে স্থলভাগে (অনশোর) এলএনজি ট্যাংকার ভেড়ার উপযোগী জেটি স্থাপনসহ আপদকালীন স্টোরেজ গড়ে তোলায় জোর দিচ্ছেন মেরিটাইম বিশেষজ্ঞরা। 
বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহের পুরোটাই মহেশখালীর দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রবেশ করে। সাধারণত এফএসআরইউ হয় রাফ ওয়েদার সহনশীল। তা ছাড়া এফএসআরইউ এমনভাবে পজিশনিং করা হয় যাতে সেখানে কার্গো স্থানান্তরকারী এলএনজি ক্যারিয়ারগুলোও ওয়েদার প্রোটেকটেড থাকে। বাংলাদেশে এফএসআরইউর মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয় ২০১৮ সালে। এক্সিলারেট এনার্জির এমএলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট এবং সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। আট বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় ছাড়া অন্য সময়ে এফএসআরইউতে এলএনজি কার্গো স্থানান্তরে সমস্যার কথা শোনা না গেলেও অতি সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে বলা হচ্ছে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কার্গো স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কারিগরি সমস্যায় একবার উভয় টার্মিনালের সরবরাহ শূন্যে নেমেছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়াজনিত কারণে স্থানান্তর বিঘিœত হওয়ার তথ্য সামনে আসেনি। 
সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা
বলা হচ্ছে সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বর বৈরী আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীতে এলএনজি স্থানান্তর সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। আবহাওয়া উন্নত হলে পরদিন সরবরাহও দ্রুত বাড়তে থাকে।
এর আগে গত আগস্টে প্রায় ১১ শ’ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার দু’টি টার্মিনালের সরবরাহ নেমে এসেছিল ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ১২ আগস্টের ওই সময়ও বৈরী আবহাওয়া ও কারিগরি সমস্যার সমন্বিত প্রভাবে এলএনজি স্থানান্তর ব্যাহত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। 
এ ছাড়া গত ৭ জুলাই এলএনজি ক্যারিয়ার সামিট এফএসআরইউতে সময়মতো বার্থ  করতে পারেনি। বলা হয়েছিল সাগর উত্তাল থাকায় ক্যারিয়ার ভিড়তে পারেনি। এতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজিভিত্তিক গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এই ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট তখনকার মোট গ্যাস সরবরাহের ১১.৮% ছিল। এতে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়েছিল। 
স্থলভাবে স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি ও জেটি স্থাপনে জোর বিশেষজ্ঞদের
জ্বালানি ও মেরিটাইম সংশ্লিষ্টরা বলছেন- বাংলাদেশে এলএনজি স্টোরেজ সুবিধা একেবারেই সীমিত। তাই ভবিষ্যতে অনশোর এলএনজি স্টোরেজ বা আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাস স্টোরেজের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা দ্রুত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যেহেতু আবহওয়া জনিত সমস্যার কথা সামনে আসছে সেজন্য এলএনজি কার্গো শিডিউল নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহের নিশ্চয়তার পাশাপাশি আবহাওয়ার অনুকূল সময়কাল বিবেচনা করা উচিত। ঘূর্ণিঝড় বা মৌসুমি বায়ু প্রবাহের সম্ভাবনা থাকলে সে অনুযায়ী সমন্বয় করার ব্যবস্থা রাখা দরকার।
তা ছাড়া বিদ্যমান বাস্তবতায় বৈরী আবহাওয়ার আগে এফএসআরইউতে কয়েক দিনের বাড়তি এলএনজি বাফার নিশ্চিত করা; এলএনজি সরবরাহের জন্য বিদ্যমান এফএসআরইউ নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প রিসিভিং ফ্যাসিলিটি তৈরি করা তথা স্থলভাগে জেটি ও আপদকালীন স্টোরেজ সক্ষমতা তৈরি করা এবং আবহওয়ার পূর্বাভাস, জাহাজের শিডিউল ও ন্যাশনাল গ্যাস সরবরাহকে একটি সমন্বিত ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় আনা জরুরি। 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈরী আবহাওয়া এখন অপারেশনাল রিস্ক থেকে ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটিট রিস্কে পরিণত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার স্থানান্তরে বিঘœও কয়েক শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; বিকল্প স্টোরেজ এবং খালাস ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য জরুরি। 
একই সাথে এফএসআরইউ ও সামুদ্রিক অবকাঠামোর ঘূর্ণিঝড় সহনশীলতা বাড়ানো ওপর গুরুত্বারোপ করে মেরিটাইম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে মুরিং সিস্টেম, ভাসমান পন্টুন, সমুদ্রতলস্থ পাইপলাইন, লোডিং-আনলোডিং ইকুপমেন্ট এবং নৌ-চলাচল ব্যবস্থার নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
এলএনজি এফএসআরইউতে ইতঃপূর্বে চাকরি করা বাংলাদেশী এক জাহাজের ক্যাপ্টেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, এফএসআরইউগুলো হয় অল ওয়েদার অপারেশনাল ইউনিট এবং এগুলোর কনটিনজেন্সি প্ল্যান থাকে। তিনি প্রশ্ন তোলেন- মাতারবাড়িতে ২০১৮ সালে এফএসআরইউ স্থাপন হলেও ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল ছাড়া কোনো সময় আবহওয়াজনিত কার্গো স্থানান্তর বিঘিœত হওয়ার প্রসঙ্গ আসেনি, এখন কেন আসছে। তিনি বলেন, রাফ ওয়েদারে এফএসআরইউ হ্যাম্পার হয় না। যদি রাফ ওয়েদারের কারণে বিঘিœত হয় তাহলে এত বছর কেন এই অজুহাত আসেনি? সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কেউ সরকারকে বিব্রত করতে এর সাথে জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। এফএসআরইউ এমনভাবে পজিশন করা যাতে এলএনজি ট্যাংকারের শেল্টার (লি ওয়ে) হয়, ট্যাংকার ভিড়তে কোনো সমস্যা না হয়। এফএসআরইউ অপারেশনের সাথে রিলেটেড এক্সপার্ট এদেশে আছে। কাজেই দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় এক্সপার্টদের কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মাধ্যমে অল্প খরচে এফএসআরইউ স্থাপনের মাধ্যমে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা গেলে ব্যয় যেমনি কমে আসবে, তেমনি ভোলার গ্যাসও আমরা ব্যবহার করতে করতে পারব।  
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অফশোর এফএসআরইউ হয় সাধারণত প্রোটেকটেড সি-তে। কিন্তু আমাদের দু’টি এফএসআরইউর অবস্থান ওপেন সি-তে। ফলে স্পর্শকাতর এই পণ্য খালাসে বৈরী আবহাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যেহেতু মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকে সেজন্য আমাদের সেটি মাথায় নিয়েই বিকল্প চিন্তা করতে হবে। স্থলভাগে (অন শোর বেসড) এলএনজি স্টোরেজ গড়ে তোলা এবং এলএনজি ক্যারিয়ার থেকে কার্গো খালাস উপযোগী জেটি স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।