মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদের অধিকাংশ দফাই অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ঐকমত্য হওয়া সত্ত্বেও আইনি ও কৌশলগত বিরোধের জালে বন্দী। ক্ষমতায় টিকে থাকার হিসাব-নিকাশের কারণেই গণভোটে পাস হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এমনটিই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বিশিষ্টজনরা। তারা আশঙ্কা করছেন, গণভোট মতে রাষ্ট্র সংস্কার না হলে দেশ ভবিষ্যতে পূর্বের অবস্থায়ও ফিরে যেতে পারে। 
সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন ও ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ প্রয়াসে আত্মপ্রকাশ করেছিল জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫। দীর্ঘ ৯ মাসের আলাপ-আলোচনা শেষে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাব সংবলিত এই ঐতিহাসিক সনদটি স্বাক্ষরিত হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চূড়ান্ত করা এই ৮৪ দফার মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাবকে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ এবং বাকি ৩৭টি প্রস্তাবকে ‘আইন, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাবগুলো বিপুল ম্যান্ডেট পেলেও রাজনৈতিক দলগুলোর আইনি ব্যাখ্যা ও কৌশলগত বিরোধে এর মূল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি বর্তমানে এক জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে। সনদের এক বছর পূর্ণ হওয়ার মুখে এসে দেশজুড়ে বড় প্রশ্ন, এই ৮৪ সংস্কারের কতটুকু আলোর মুখ দেখল, আর কতটুকুই বা ফাইলবন্দী হয়ে রইল?
সূত্র মতে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত হওয়া গণভোটে ভোটাররা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দেন। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা চালুকরণ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার যৌক্তিক বণ্টন ও ভারসাম্য, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করে স্বায়ত্তশাসন প্রদান, সুরক্ষায় মৌলিক অধিকারের সম্প্রসারণ ইত্যাদি। এই সংস্কারগুলো দেশের নির্বাচনী ও সাংবিধানিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রূপান্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পথ চিরতরে বন্ধ করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে গণভোটে সাংবিধানিক ধারাগুলো পাস হলেও আইনি জটিলতা এবং দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের কারণে সনদের একটি বড় অংশ- বিশেষ করে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বড় অংশটি এখনো ফাইলবন্দী বা মন্থর হয়ে আছে। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ‘সংসদ সদস্য’ এবং একই সাথে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে দুটি পৃথক শপথ নেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সংসদ সদস্যরা এই শপথ নিলেও দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এই আদেশকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে দ্বিতীয় শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে এই রূপান্তর পরিষদটি শেষ পর্যন্ত আর গঠিত হতে পারেনি। উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, যাতে সব দলের সুষম অংশীদারত্ব থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র বিরোধে, বিশেষ করে বিএনপির কৌশলগত আপত্তির মুখে এটি ঝুলে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের জন্য সনদে ২১টি ধাপের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে বিএনপি ভিন্নমত প্রকাশ করে। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি উচ্চ ও নি¤œ উভয় কক্ষে পাস করানোর বাধ্যবাধকতার বিষয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর চূড়ান্ত ঐকমত্য না হওয়ায় তা ফাইলবন্দী হয়ে আছে। সংসদে নারীদের আসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল ভিন্নমত দেয়ায় নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি গতি হারিয়েছে। মূল ৮৪ দফা সংস্কার মূলত সংবিধান, নির্বাচন ও বিচার বিভাগকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, স্থানীয় সরকার, নারী অধিকার এবং শ্রম খাতের সংস্কার কমিশনের দেয়া ১৬৬টি সুপারিশের বেশির ভাগই জুলাই সনদের মূল রূপরেখায় স্থান পায়নি। এর ফলে এই খাতগুলোর কাঠামোগত সংস্কার বর্তমানে পুরোপুরি মন্থর ও ফাইলবন্দী অবস্থায় রয়েছে।
 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান বিশেষ সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমেদ বলছেন, বিএনপি জুলাই সনদের চেতনা ও এর সংস্কারের প্রতি শতভাগ অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দেয়া ‘বাস্তবায়ন আদেশ’ এবং সংসদ সদস্যদের দ্বৈত শপথের বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনি এখতিয়ার বহির্ভূত ছিল। আমরা কোনো বেআইনি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারি না। আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও বলেছি, জুলাই সনদের মূল স্পিরিট অনুযায়ীই আমরা সংবিধান সংস্কার করব। বর্তমানে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে আমরা সব রাজনৈতিক অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে একটি চূড়ান্ত রূপরেখা পেশ করার লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত কাজ করছি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান একাধিকবার গণমাধ্যমে বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেয়া যাবে না। আমরা মনে করি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে এই ৮৪ দফা সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা উচিত।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিরা বলছেন, জনগণ ফ্যাসিবাদের বিলোপ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের নিজস্ব আসন ও ক্ষমতার সমীকরণের জন্য জুলাই সনদের সংস্কারগুলোকে ফাইলবন্দী করে রাখে, তবে ছাত্র-জনতা তা মেনে নেবে না। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের মতো বিষয়গুলো জনগণের ম্যান্ডেট, একে দ্রুত আইনি কাঠামোতে আনতে হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গণভোটের রায় নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে সংলাপে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও দলটির ৩১ দফার আলোকেই মূলত সংবিধানে ১৮তম সংশোধনী আনা হচ্ছে। জুলাই সনদে যেসব ইস্যুতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, সেখানে প্রাধান্য পাবে বিএনপিসহ মিত্র দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার। ফলে, সম্ভাব্য এই সংশোধনীর সাথে সরাসরি গণভোটের রায়ের কোনো সম্পর্ক থাকছে না। এরই মধ্যে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি একাধিক বৈঠক করে এসব বিষয়ে অংশীজনসহ বিশিষ্টজনদের মতামত নিচ্ছেন। আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের শীতকালীন ও ইংরেজি নতুন বছর ২০২৭-এর প্রথম অধিবেশনেই আসতে পারে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল। 
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জুলাই সনদ কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তা সনদ আদেশেই বলা আছে। যদি সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও জনগণের রায়ের আলোকে সংস্কার না হয়, তাহলে আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলব। 
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এ প্রতিবেদককে জানান, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কারপ্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে, সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সাংবিধানিক পরিবর্তন আনতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে দাবি আদায়ে সংসদ ও রাজপথ, দুই জায়গাতেই আন্দোলন চলবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, জুলাই সনদ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য রাজনৈতিক দলিল, যেখানে দলগুলো প্রথমবারের মতো সংস্কারে একমত হয়েছিল। গণভোটে সাংবিধানিক বিষয়গুলো পাস হওয়া দেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। কিন্তু বড় দলগুলোর আইনগত অনীহা এবং ক্ষমতার টিকে থাকার হিসাব-নিকাশের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার আটকে গেছে। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে গণভোট তো দূরের কথা, তাদের দেয়া নির্বাচনী ইশতেহারই এখন বাস্তবায়ন করছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশ ভবিষ্যতে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই সনদের ৮৪ দফা সংস্কার বাংলাদেশের রাষ্ট্র মলাট পরিবর্তনের এক মহাপরিকল্পনা। গণভোটের মাধ্যমে এর মূল স্তম্ভগুলো আলোর মুখ দেখলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারের একটি বড় অংশ এখনো দলীয় রাজনীতির বেড়াজালে বন্দী। বিশেষ সংসদীয় কমিটির বর্তমান তৎপরতা যদি সফল হয়, তবেই কেবল ফাইলবন্দী থাকা প্রস্তাবগুলো আলোর মুখ দেখবে এবং একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হবে।