নিজস্ব প্রতিবেদক

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর প্রস্তাবিত খসড়া মৌলিকভাবে পর্যালোচনার জন্য সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকরা যাতে এ আইনের কারণে হয়রানি বা হয়রানিমূলক মামলার শিকার না হন, সে জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষার বিষয়ে সুপারিশ করবে কমিটি।
কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা ও সদস্যদের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সম্পাদক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের এতে রাখা হবে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের অংশীজনদের সাথে আয়োজিত পরামর্শ সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বরের পর প্রস্তাবিত আইন নিয়ে এটি ছিল দ্বিতীয় বৈঠক।
প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদকে পর্যালোচনা কমিটির ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি সম্পাদক পরিষদ, অ্যাটকো (অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স) এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ করে কমিটি গঠন ও বৈঠকের আয়োজন করবেন।
গণমাধ্যমকে হয়রানি না করার দাবি : সভায় সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় একটি কার্যকর আইনের প্রয়োজনীয়তার প্রতি সমর্থন জানান। তবে প্রস্তাবিত আইনের কিছু ধারা গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে আইনের আওতার বাইরে রাখার অথবা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সুরক্ষা দেয়ার দাবি জানানো হয়। একই সাথে প্রস্তাবিত আইনে মোবাইল কোর্টের বিধান রাখারও বিরোধিতা করেন সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা।
তাদের এসব উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব আসে। দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনামের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকার এ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
‘সাংবাদিকদের টার্গেট করা হয়নি’ : সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কোনো সাংবাদিক যেন এ আইনের শিকার না হন এবং আইনের অপপ্রয়োগ না হয়- সরকারও তা চায় না।
তিনি বলেন, পর্যালোচনা কমিটি গণমাধ্যমের বিষয়ে যথাযথ সুপারিশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর আইনের খসড়াটি আবারো সাধারণ মানুষের মতামতের জন্য সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে সাইবার অপরাধ মোকাবেলার পাশাপাশি আইনটির অপপ্রয়োগের সুযোগও কমিয়ে আনা।
‘সংশোধন ছাড়া পাস হলে বৃহৎ কারাগার’ : বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, সংশোধন ছাড়া এ আইন পাস হলে দেশ একটি বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে যে মূল্যবোধ প্রত্যাশা করা হয়, তার প্রতিফলন প্রস্তাবিত খসড়া আইনে নেই। তার ভাষায়, সরকার ‘নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার আইন’ করছে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর প্রয়োগের বাস্তবতাও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যালোচনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে খসড়ায় মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান মাহফুজ আনাম।
দ্বিতীয় দফায় পরামর্শ : সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনা হয়। এরপর গণমাধ্যমের উদ্বেগ ও আপত্তির বিষয়গুলো নিয়ে সোমবার দ্বিতীয় দফায় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হলো।
এবারের সভায় খসড়াটি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পুনর্মূল্যায়ন এবং গণমাধ্যমের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে খসড়ায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি তা আবার জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশের কথা জানিয়েছে সরকার।
সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।