সংসদ প্রতিবেদক

রাড্ডাকাণ্ডের জেরে অবশেষে সংসদ সদস্যপদ ছাড়লেন বিএনপির সংরতি নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসার পর গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পদত্যাগপত্রে মিষ্টি লিখেছেন, তিনি সম্পূর্ণ ‘সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে কোনো কারণ উল্লেখ করেননি। পদত্যাগপত্র পাওয়ার সাথে সাথেই তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্পিকার। 
গতকাল বেলা পৌনে ২টার দিকে স্পিকারের সাথে সাাৎ করেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। সাাৎ শেষে তিনি সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেও পদত্যাগের বিষয়টি সরাসরি নিশ্চিত করেননি। তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির ডিসিশন যেটা হবে, সেটা হবে।’ রাড্ডাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তের কথাও বলেন তিনি। এর কিছুণ পরই স্পিকারের প থেকে তার পদত্যাগপত্র পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।  
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পরে সাংবাদিকদের বলেন, সংরতি নারী আসনের ২৩ নম্বর সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি তার কার্যালয়ে এসে লিখিত পদত্যাগপত্র দিয়ে গেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পদত্যাগপত্র পাওয়ার পরই তার আসন শূন্য হয়ে গেছে। পদত্যাগপত্রটি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, সংসদের বিধান অনুযায়ী কোনো সদস্য পদত্যাগের সময় কারণ উল্লেখ করেন না। 
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছে, ফেরদৌসী আহমেদ পদত্যাগ করায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরতি মহিলা আসন-২৩ সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ওই তারিখেই শূন্য হয়েছে। ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে মিষ্টির অধ্যায় শেষ হলো শপথ নেয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যেই। 
মিষ্টির পদত্যাগের পেছনে সরাসরি রাজনৈতিক কারণ হিসেবে সামনে এসেছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় অবস্থিত ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মুখোশধারী বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি হামলা চালায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট ও ভাঙচুর চালানোর পর ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনাটির বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেয়। ঘটনার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড দেখা যায়। এ ঘটনায় জমি দখলের চেষ্টা ও পরিকল্পিত হামলার অভিযোগও সামনে আসে। 
ঘটনার পরপরই আলোচনায় আসে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নাম। অনুসন্ধানে উঠে আসে, সমিতিটির সাথে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার যোগাযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশার নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। স্থানীয়ভাবে তারা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে মিষ্টির সাথে সমিতিটির পুরনো সম্পর্ক নিয়ে। জানা যায়, ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। এরও আগে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে করা আবেদনের নথিতে সভাপতি হিসেবে তার স্বার থাকার তথ্য সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমানও সমিতির সাথে মিষ্টির সম্পৃক্ততার নথি প্রকাশ করেন। 
তবে মিষ্টি বর্তমানে ওই সমিতির সাথে কোনোভাবে যুক্ত নন বলে দাবি করেছেন। একই সাথে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সাথে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। 
রাড্ডাকাণ্ডের গুরুত্ব বাড়তে থাকে হামলায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের নাম আসার পর। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। এ অবস্থায় মিষ্টির রাজনৈতিক ভূমিকা ও তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, তদন্তে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে মিষ্টির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি দলীয় ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থাকে পৃথক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 
এ দিকে, রাড্ডাকাণ্ড নিয়ে সরকারের অবস্থানও কঠোর হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মিষ্টিকে সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নিশ্চিত করেন। ওই নির্দেশের পরই জাতীয় সংসদে গিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। 
মিষ্টি বিএনপির মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরতি নারী আসনের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাতীয় সংসদে সংরতি নারী আসন রয়েছে ৫০টি। সরাসরি নির্বাচনে পাওয়া আসনের অনুপাতে দলগুলোর মধ্যে এসব আসন বণ্টন করা হয়। এবারের সংসদে বিএনপির জন্য ৩৬টি সংরতি নারী আসন নির্ধারিত হয়। গত ৩০ এপ্রিল সংরতি নারী আসনের সদস্যদের গেজেট প্রকাশ এবং ৩ মে তাদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ শপথ নেয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যেই সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হলো মিষ্টিকে।
তবে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে রাড্ডাকাণ্ডের আইনি বা তদন্তগত অধ্যায় শেষ হচ্ছে না। বরং সংসদ সদস্যপদ হারানোর পর এখন হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও জমি দখলের অভিযোগে চলমান তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, সেটিই হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিকভাবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কী ঘটেছিল, কারা হামলা চালিয়েছিল এবং এর নেপথ্যে কারা ছিলÑএসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে তদন্তের পরবর্তী ফলাফলের ওপর। রাড্ডাকাণ্ডে মিষ্টির পদত্যাগ তাই এক দিকে তার কয়েক মাসের সংসদীয় অধ্যায়ের আকস্মিক সমাপ্তি, অন্য দিকে বহুল আলোচিত ওই হামলার তদন্তকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। 
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির রাজনৈতিক জীবনের শুরু বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে। পরে কলেজ ছাত্র সংসদের এজিএস নির্বাচিত হয়ে সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পারিবারিক রাজনৈতিক বলয়ও তার উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি ঢাকা-৮ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন এবং ধানমন্ডিতে নিহত অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর ওই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন মিষ্টি। পরে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে মিরপুরকেন্দ্রিক রাজনীতিতে পরিচিতি পান।