নিজস্ব প্রতিবেদক

- মোজাম্মেল হক বাবুর সব মেডিক্যাল নথি ৭ অক্টোবরের মধ্যে জমার নির্দেশ
- তারেক সাঈদকে চিকিৎসা, লিটনসহ ৩৪ আসামিকে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি
- টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতন মামলায় সাী না আসায় স্যাগ্রহণ পিছিয়ে ১৩ অক্টোবর

এক দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই বেঞ্চে পৃথক চারটি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ আদেশ হয়েছে। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবুর পিএসএ পরীার ফলসহ সব মেডিক্যাল নথি আগামী ৭ অক্টোবরের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই বেঞ্চ কারাবন্দী সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে কারাবিধি অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজশাহীতে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ গ্রেফতার না হওয়া ৩৪ আসামিকে হাজিরের জন্য জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলায় সাী উপস্থিত না হওয়ায় স্যাগ্রহণ পিছিয়ে ১৩ অক্টোবর করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের পৃথক বেঞ্চ এসব আদেশ দেন।
চার মামলার আদেশের ধরন ভিন্ন হলেও দিনের কার্যক্রমে কারাবন্দীদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, পলাতক আসামিদের আদালতের প্রক্রিয়ায় হাজির করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় স্যাগ্রহণের ধারাবাহিকতাÑ এ তিনটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
বাবুর মেডিক্যাল রিপোর্ট ৭ অক্টোবরের মধ্যে : শাপলা চত্বরের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবুর পিএসএ পরীার ফলসহ তার সংশ্লিষ্ট সব মেডিক্যাল রিপোর্ট আগামী ৭ অক্টোবরের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে জমা দিতে কারা কর্তৃপকে নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বাবুর পে করা আবেদনের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল এ নির্দেশ দেন।
আইনজীবী ও পারিবারিক সূত্রের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই কারা কর্তৃপরে উদ্যোগে বাবুর প্রস্টেট-স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন বা পিএসএ পরীা করা হয়। কিন্তু ওই পরীার ফলাফল কিংবা চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তার পরিবার বা আইনজীবীদের সরবরাহ করা হয়নি। এ অবস্থায় বাবুর শারীরিক অবস্থা এবং রোগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পরিবার ও আইনজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। আবেদনে বলা হয়, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার স্বাস্থ্যের অবনতির পরিপ্রেেিতই পিএসএ পরীা করা হয়েছিল।
শুনানির পর ট্রাইব্যুনাল নির্দেশ দেন, ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই বাস্তবে পিএসএ পরীা করা হয়ে থাকলে তার ফলাফলের অনুলিপি এবং সংশ্লিষ্ট সব মেডিক্যাল রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে। এ জন্য ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে।
মামলার নথি ও বাবুর পে করা আবেদনে তার ক্যান্সারের চিকিৎসার একটি দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বায়োপসি ও ইমেজিং পরীায় ‘গ্লিসন ৩+৪ অ্যাডেনোকার্সিনোমা’ শনাক্ত হয়। পরে তার র‌্যাডিক্যাল প্রস্টেটেক্টমি অস্ত্রোপচার করা হয়। বর্তমানে তার রোগের অবস্থা নির্ধারণে হালনাগাদ চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আবেদনে বাবুর রোগের বর্তমান স্টেজ সম্পর্কে যে দাবি করা হয়েছে, সেটি আদালতের নিজস্ব মেডিক্যাল পর্যবেণ নয়। হালনাগাদ পিএসএ রিপোর্ট ও অন্যান্য মেডিক্যাল নথি হাতে পাওয়ার পরই তার বর্তমান চিকিৎসাগত অবস্থার বিষয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে বলা সম্ভব হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন বাবু। তার আবেদনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা বলা হয়েছে। এটি তার নিজের বক্তব্য; এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাবুর পে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মিসবাহ। রাষ্ট্রপে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জহিরুল আমিন।
হামলার অভিযোগের পর তারেক সাঈদকে চিকিৎসার নির্দেশ : একই দিনে ট্রাইব্যুনাল-২ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে কারাবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জ কারাগারে তার ওপর হামলার অভিযোগ তুলে চিকিৎসা ও বিচারিক তদন্ত চেয়ে আবেদন করেছিলেন তারেক সাঈদের আইনজীবী। শুনানির সময় বিচারিক তদন্তের আবেদনটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় করা হয়নি উল্লেখ করে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ফলে ট্রাইব্যুনালের আদেশের মূল বিষয় ছিল তার চিকিৎসা নিশ্চিত করা। শুনানিতে আইনজীবী মাহমুদুল হুসাইন রুবেল অভিযোগ করেন, ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে কয়েকজন কারারী লাঠিসোঁটা নিয়ে তারেক সাঈদের ওপর হামলা করেন। এতে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে বলে দাবি করেন তিনি। হামলার সময় কারাগারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলেও আইনজীবী অভিযোগ করেন।
আইনজীবীর দাবি, হামলার পর তারেক সাঈদকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর করা হলেও যথাযথ চিকিৎসা-সংক্রান্ত সনদ দেয়া হয়নি। এ কারণে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে বলে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়।
অন্য দিকে প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন শুনানিতে বলেন, তারেক সাঈদ নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাকে কনডেম সেলে রাখার কথা। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কোনো অভিযুক্ত অসুস্থ হলে চিকিৎসা দেয়ার বিষয়ে সাধারণত প্রসিকিউশনের আপত্তি থাকে না।
প্রসিকিউশন আরো উল্লেখ করেন, তারেক সাঈদ আগের দিন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন এবং তখন তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা জানাননি। দুই পরে বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনাল কারাবিধি অনুযায়ী তারেক সাঈদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে কারা কর্তৃপকে নির্দেশ দেন।
লিটনসহ ৩৪ জনকে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজশাহীতে দুই আন্দোলনকারীকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ গ্রেফতার না হওয়া ৩৪ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
বৃহস্পতিবার এ মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশনের পে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা।
শুনানিতে প্রসিকিউটর জানান, মামলার ৩৪ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী গেলেও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ কারণে গ্রেফতার কার্যকর না হওয়ার প্রতিবেদন বা নন-এক্সিকিউশন রিপোর্ট দেয়া হয়েছে।
এরপর ওই আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার জন্য দু’টি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ২৭ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে।
এ মামলায় মোট আসামি ৩৮ জন। তাদের মধ্যে রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো: আসাদুজ্জামান আসাদ, ডাবলু সরকার, জহিরুল ইসলাম রুবেল ও মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাদের বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
গ্রেফতার না হওয়া ৩৪ আসামির মধ্যে রয়েছেন এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, বিপ্লব বিজয় তালুকদার, হুমায়ুন কবির, রকি কুমার ঘোষ, রাশিক দত্ত, বাপ্পী চৌধুরী রনি, মহিদুল ইসলাম মোস্তফা, খালিদ হাসান বিপ্লব, রাশেদুল করিম রোজেল, মেহেদী হাসান ওরফে রনি, জেডু সরকার ওরফে জাবেদুর রহমান, আব্দুল হামিদ সরকার ওরফে টেকন, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনার, আরমান আলী, আব্দুল মোমিন, শাহাদত হোসেন শাহু, তৌহিদুল হক সুমন, মাহতাব হোসেন চৌধুরী, আলাউদ্দিন ওরফে আলাল, সরিফুল ইসলাম বাবু, মো: নাবিল হাসান, মাহমুদুল হাসান রাজীব, ফরহাদ হোসেন বিপ্লব, তৌরিদ আল মাসুদ রনি, মেহেদী হাসান রিমেল ওরফে রিগেন, আশরাফুল ইসলাম জাফর, সুকান্ত কুমার দাস, ফয়সাল আহমেদ রুনু, নুর মোহাম্মদ সিয়াম, আসাদুল্লা-হিল-গালিব, গোলাম কিবরিয়া, আলাল পারভেজ লুলু, মনিরুজ্জামান খান ওরফে মনির এবং শফিকুজ্জামান ওরফে শফিক।
এর আগে ৩০ জুলাই প্রসিকিউশন ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ১৮ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল সে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন।
সাী না আসায় পেছাল টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতন মামলার স্যা : অন্য দিকে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে নির্ধারিত স্যাগ্রহণ হয়নি। সাত নম্বর সাী উপস্থিত না থাকায় প্রসিকিউশনের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেেিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আগামী ১৩ অক্টোবর স্যাগ্রহণের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
প্রসিকিউশন জানায়, বৃহস্পতিবার সাত নম্বর সাীর স্যা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি উপস্থিত না হওয়ায় সময় চাওয়া হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
মামলার ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক রথ্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, কর্নেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, কর্নেল মো: মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সারওয়ার বিন কাশেম।
মামলার অন্য সাত আসামি পলাতক। তারা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক প্রতিরাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক রথ্যাবের মহাপরিচালক এম খুরশিদ হোসেন, সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ এবং সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: খায়রুল ইসলাম।