মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন ফ্রান্স থেকে
ফরাসি রাজধানী প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কিংবা নটর-ডাম ক্যাথেড্রালের ভিড়ে নীরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন এক অনন্য স্থাপত্য- ‘গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিস’। ১৯২৬ সালের ১৫ জুলাই উদ্বোধনের পর এক শতাব্দী অতিক্রম করে ঐতিহাসিক এই মসজিদটি আবারো বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। এটি কেবল ফরাসি মুসলিমদের উপাসনালয় নয়, বরং ফ্রান্সের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদী সমাজের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অমর নিদর্শন।
গ্র্যান্ড মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) এক বেদনাময় প্রেক্ষাপট। যুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে উত্তর আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন তৎকালীন ফরাসি উপনিবেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মুসলিম সৈন্য লড়াই করেন, যার মধ্যে প্রায় এক লাখ সেনা প্রাণ হারান। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মৃতি স্মরণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্যারিসের লাতিন কোয়ার্টারে একটি মর্যাদাপূর্ণ মসজিদ নির্মাণের জোরালো ভিত্তি তৈরি হয়। সাংবাদিক পল বুরদারির প্রচেষ্টায় ফরাসি সরকার এতে পূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থন দেয়।
১৯২২ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর চার বছর ধরে মরক্কো ও উত্তর আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চল থেকে আসা ৪৫০ জন দক্ষ কারিগর এই মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। উঁচু মিনার, সবুজ টালির ছাদ, সুদৃশ্য খিলান, জ্যামিতিক নকশা এবং বিস্তৃত বাগানের সমন্বয়ে মসজিদটি তৈরি। ফরাসি স্থপতি মরিস মানতু ও তার সহযোগীরা এর নকশা এমনভাবে তৈরি করেন, যা প্যারিসের নগর-পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখেও দর্শনার্থীদের মুহূর্তের মধ্যে উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছে যাওয়ার এক মোহনীয় অনুভূতি দেয়।
গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিস ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি বর্তমানে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার, সভাকক্ষ, ঐতিহ্যবাহী হাম্মাম ও ক্যাফে নিয়ে ফরাসি মুসলিমদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র। ১০০ বছর ধরে ঔপনিবেশিক যুগ থেকে আধুনিক ইউরোপের রূপান্তরের সাক্ষী এই মসজিদটি আজ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের মেলবন্ধনের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।





