নিজস্ব প্রতিবেদক

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য কর্মপরিবেশ ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা শারীরিক হামলা, গ্রেফতার, আইনি হয়রানি, লাঞ্ছনা, কাজে বাধা ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস-বিএজের মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের মূল ধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে সংগৃহীত তথ্য ও নিজস্ব সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এই মাসে অন্তত ৭০ জন সংবাদকর্মী বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে শারীরিক হামলা ও আঘাতের শিকার হন ৪০ জন, আইনি হয়রানির শিকার হন আটজন এবং হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হন ২২ জন সংবাদকর্মী। সংবাদকর্মীদের নিজেদের মধ্যে কোন্দলে যশোরের কেশবপুর প্রেস ক্লাবে দুই গ্রুপের মারামারিতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক দলের প্রোগ্রামে উপস্থিত হয়ে আটক হয়েছেন একজন। এ ছাড়া এক সাংবাদিকের সাথে তার শিশুসন্তানের ওপরও হামলা করা হয়।
আগস্ট মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কিশোর গ্যাং এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে ১৯ টি ঘটনায় অন্তত ৪০ জন সাংবাদকর্মী আহত হয়েছেন।
কক্সবাজারে এক সাংবাদিকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাং। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেদের জায়গায় ঘর নির্মাণ শুরু করলে গ্যাং সদস্যরা ধারালো কিরিচ ও হাতুড়ি নিয়ে হামলা চালায়। এতে সাংবাদিকের মাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে এবং ছোট ভাইকে কুপিয়ে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম করা হয়।
চাঁদপুরের কচুয়ায় এক যুবকের বিরুদ্ধে তার ভাতিজিকে ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয়। পথরোধ করে হামলা চালানোর সময় তার সাথে থাকা শিশুকন্যাকেও মারধর করে আহত করা হয় ।
ঢাকার পল্লবীতে ‘আশিক গ্রুপ’-এর চাঁদাবাজি নিয়ে সংবাদ সম্প্রচার করায় রাত ২টার দিকে মোটরসাইকেলে এসে সন্ত্রাসীরা সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাসায় হামলা ও গুলিবর্ষণ করে।
ঢাকার মিরপুরে অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে উচ্ছৃঙ্খল হকাররা একাত্তর টিভি, সময় টিভি, যমুনা টিভি ও ঢাকা পোস্টের অন্তত ছয় সাংবাদিককে ঘেরাও এবং ধাওয়া করে মারধর করে, ক্যামেরা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা চালায় এবং যমুনা টেলিভিশনের গাড়ি ভাঙচুর করে।
সাংবাদিকদের আইনি হয়রানির শিকারের ঘটনাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত আটজন সাংবাদকর্মী আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন।
নওগাঁয় জমির দখল নিয়ে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে মামলায় এক সাংবাদিককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মামলার বাদি নিজেই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, তিনি ওই সাংবাদিককে চেনেনই না এবং এজাহারে কিভাবে তার নাম এসেছে, তা তিনি জানেন না। মূলত স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আগের সংবাদ প্রকাশের আক্রোশ মেটাতে চেয়ারম্যানের প্রভাব খাটিয়ে তাকে এ মামলায় জড়ানো হয় বলে ভুক্তভোগী সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন।
বরগুনায় চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার এক সাংবাদিকের ডোপ টেস্ট করিয়েছে পুলিশ। পরিবারের দাবি মামলাটি ষড়যন্ত্রমূলক। এ ছাড়া মামলার এজাহারে তার বিরুদ্ধে মাদক সেবন, বহন বা মাদকসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ নেই। পরীক্ষার প্রতিবেদনেও তার শরীরে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এই সাংবাদিককে দুই হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে তুলেছে পুলিশ।
সেপ্টেম্বর মাসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হুমকি, হেনস্তা ও বাধার সম্মুখীন হন অন্তত ২২ জন সাংবাদিক।
ঘাটাইলে পৌরসভার উন্নয়নকাজ ও আর্থিক হিসাবের তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে লিখিত আবেদন করলে এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এক সাংবাদিককে ফোন করে অসৌজন্যমূলক ভাষায় কথা বলেন এবং সরাসরি ‘অফেন্সিভ মোডে’ যাওয়ার হুমকি দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংবাদিকদের ওপর চলমান এই আক্রমণ, বাধা ও আইনি হয়রানির জন্য আইনের শাসনের ঘাটতি ও বিচারহীনতাই দায়ী বলে মনে করে বিএজে। যা মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য হুমকি। সরকারকে অনুধাবন করতে হবে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিএজে অবিলম্বে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে ।