হারুন ইসলাম
একটি ভোটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা ছিল তরুণদের। আওয়ামী আমলে কেউ ভোট দেয়ার বয়স পেয়েও ভোট দিতে পারেননি। কেউ ভোট দিতে চাইলেও নিরাপত্তার কারণে পরিবার থেকে বাধা পেয়েছেন। আবার কারো কাছে ভোটই মনে হয়েছে অর্থহীন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর সেই মানসিকতায় বড় পরিবর্তন আসে। তরুণসমাজ রাজনীতিকে দূরের কোনো বিষয় নয়, নিজেদের ভবিষ্যতের সাথে জড়িয়ে দেখতে শুরু করে।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দেয়া তরুণদের প্রত্যাশাও ছিল অনেক। কর্মসংস্থান, সুশাসন, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সংস্কার ছিল তাদের প্রধান চাওয়া। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার ছিলেন প্রায় ৫ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট ভোটারের ৪৩.৫৬ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারির সেই ভোটের পর এখন প্রায় আট মাসের বাস্তবতা সামনে। প্রশ্ন উঠছে, তরুণরা যে পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, তার কতটা মিলছে বাস্তবতার সাথে? গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো বলছে, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, আবার কিছু পুরনো সঙ্কটও নতুন রূপে সামনে এসেছে।
তরুণদের প্রত্যাশার সবচেয়ে বড় জায়গা চাকরি বা কর্মসংস্থান। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিক্ষার সাথে চাকরির বাজারের সামঞ্জস্যের অভাব এখনো বড় সমস্যা। সেপ্টেম্বরের আইএমএফ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী পোস্ট-সেকেন্ডারি শিক্ষিত তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশ বেকার। অর্থাৎ যত বেশি পড়াশোনা, তত দ্রুত চাকরি এমন সমীকরণ এখানে কাজ করছে না।
চাকরির বাজারের চাপ বোঝা যায় নিয়োগ পরীক্ষার প্রতিযোগিতা থেকেও। গত বছর মাত্র ২ হাজার ৪০০ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের চাকরির বিপরীতে ৪২ লাখ ৫৭ হাজার আবেদন পড়েছিল। পোশাক খাতের ১১ হাজার ৩৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৫২ লাখের বেশি মানুষ।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীর কাছে নির্বাচন মানে শুধু সংসদ বা সরকার নয়। নির্বাচন মানে পড়াশোনা শেষে একটি স্বচ্ছ চাকরির সুযোগও। বিসিএস বা একটি নিয়োগ পরীক্ষার পেছনে বছরের পর বছর না ছুটেও সম্মানজনক পেশায় ঢোকার সুযোগ। চাকরি আছে, কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ঘুষ, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তরুণদের আস্থায় ফাটল তৈরি করে।
নির্বাচনের আগে বগুড়ার প্রথমবারের ভোটার মোনিকা আক্তার বলেছিলেন, তিনি স্বচ্ছ নিয়োগ ও পরীক্ষাপদ্ধতি চান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়শা তোফায়েল ন্যায্য নিয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষা ও তরুণদের সহায়তার কথা বলেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইমুন নোমানের প্রত্যাশা ছিল জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনীতির চাপও তরুণদের বাস্তবতায় বড় হয়ে উঠেছে। আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.২৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ শতাংশে নেমেছে। তবে সিপিডির ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। কারণ দাম আগেই অনেক বেড়ে গেছে।
অর্থাৎ পরিসংখ্যানের গ্রাফ একটু নিচে নামলেও বাজারের ব্যাগ এখনো হালকা। চাকরি না থাকা তরুণের জন্য এই চাপ আরো বেশি। আয় নেই, অথচ খাবার, বাসা ভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ আছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট। আগস্টের শেষ দিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি একপর্যায়ে ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সঙ্কটের সাথে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে, সেচ ব্যাহত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছোট ব্যবসাও। সেপ্টেম্বরে আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘটনাও সঙ্কট বাড়ায়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত, এলএনজির দাম বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ সঙ্কট এর বড় কারণ। কিন্তু তরুণের কাছে কারণের চেয়ে ফলাফলটাই বেশি দৃশ্যমান। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, কারখানার উৎপাদন কমছে, তাহলে নতুন চাকরি আসবে কোথা থেকে? এই প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
আইনশৃঙ্খলাও তরুণদের উদ্বেগের জায়গা। সেপ্টেম্বরের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ কয়েকটি অপরাধ কমার কথা জানান। একই সাথে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর পুলিশকে ভেঙে পড়া মনোবল পুনরুদ্ধার করতে হয়েছে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় হত্যা কিছুটা বেড়েছে, যদিও চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি কমেছে।
অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারি বক্তব্যেও সব সঙ্কট শেষ হয়ে যাওয়ার দাবি নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, জুলাইয়ের পরও তিনি সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা দেখেছেন। তার প্রত্যাশা ছিল গণপিটুনি ও সহিংসতার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং মতভিন্নতার মানুষকে নিরাপদে কথা বলার সুযোগ দেয়া।
এ দিকে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা উদ্বেগ জানান। তাদের আশঙ্কা, ভুল তথ্য, মানহানি, কনটেন্ট ব্লক ও গ্রেফতারের কিছু বিধান যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া থাকলে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকার বলছে, মতপ্রকাশ বা সাংবাদিকতা দমনের উদ্দেশ্যে আইনটি করা হচ্ছে না। ফলে আইনটির প্রয়োগ ও সুরক্ষা নিয়ে বিতর্ক এখনো রয়েছে।
ভয় ছাড়া কথা বলার অধিকারও ছিল তরুণদের বড় প্রত্যাশা। মোহাম্মদ সাইমুম জাহান বলেছিলেন, আমরা চেয়েছিলাম যে দলই ক্ষমতায় আসুক, সরকারের সমালোচনা করার অধিকারসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারকে সঙ্কটের ইস্যু এড্রেস করে সমালোচনা করলেই গ্রেফতারের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আগে যে আশা শুনেছিলাম এখন তার বিপরীত চিত্র দেখছি। পুরনো পথেই এই সরকার হাঁটছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ আন্দোলনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, তেমন অগ্রগতি তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। পড়াশোনা শেষ করে তার সবচেয়ে বড় চিন্তা সম্মানজনক কাজ পাওয়া। নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আবারো দেখছি। এসব নিয়ে সরকারের তেমন পদক্ষেপও নেই। স্বজনপ্রীতি, হানাহানির যে অবসান হওয়ার দরকার ছিল সেটা হচ্ছে না। আমি মনে করি এখানে সরকারের সদিচ্ছা দরকার।
বর্তমানে জ্বালানি বিদ্যুৎ নিয়েও সরকার কার্যকর পরিকল্পনা নেই বলে অভিযোগ করেন।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সেপ্টেম্বরে বলেছে, সংসদে পাস হওয়া তিনটি আইনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি কিছু মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে। সংস্থাটি অতীতের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো লঙ্ঘনের ঝুঁকির কথা বলেছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মূল্যায়ন; সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের অবস্থান আলাদা হতে পারে।
আওয়ামী লীগও পুরোপুরি অদৃশ্য নয়
তরুণদের রাজনৈতিক আলোচনায় নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রশ্নও এখনো রয়েছে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সরকারি প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা একটি রিট খারিজ করে। তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দলটির তৎপরতার খবর এসেছে।
১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর গুলশানে আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাশ মিছিলের ঘটনায় গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয়। ২০ সেপ্টেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার খবরও আসে। পলাতক শেখ হাসিনা জুনে এনডিটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা বলেছেন এবং আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন। একই সময়ে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাও এগোচ্ছে।
সরকারের অবস্থান সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ২৬ সেপ্টেম্বর বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ শক্তিকে আর রাজনীতি করতে দেয়া হবে না। তবে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান ও বৈধতার প্রশ্ন আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার সাথেও যুক্ত।
সবমিলিয়ে জুলাইয়ের তরুণদের সামনে এখন নতুন পরীক্ষা। তারা যে পরিবর্তনের জন্য রাস্তায় নেমেছিল, সেটি শুধু একটি দলকে সরানোর পরিবর্তন ছিল নাকি রাষ্ট্র ও রাজনীতির সংস্কারও ছিল, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বায়েজিদ বোস্তামী মনে করেন, আন্দোলনের মূল চেতনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুস্তানসির বলেন, আন্দোলনের সময় তাদের চাওয়া ছিল গণতন্ত্র, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ, বিচার এবং বাকস্বাধীনতা। এসব প্রত্যাশার কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে তার হতাশা রয়েছে। আরেক শিক্ষার্থী লামিয়া ইরশাদ বলেন, আন্দোলনের প্রত্যাশা পূরণে তিনি তেমন অগ্রগতি দেখছেন না। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়াই এখন তার সবচেয়ে বড় চিন্তা।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে একই ধরনের প্রশ্ন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা ও মাহমুদুল হাসানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৩৪.৬২ শতাংশ ১৫-২৯ বছর বয়সী। কিন্তু শিক্ষা, দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। তাদের মতে, শুধু শিক্ষার প্রসার বাড়ালেই হবে না; বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। সমান মতপ্রকাশের সুযোগ দিতে হবে।
এখন পর্যন্ত নতুন ভোটারের প্রশ্ন খুব সরল। চাকরি হবে কি? নিয়োগে তদবির লাগবে কি? বাজারে পরিবারের খরচ চলবে কি? গ্যাস-বিদ্যুৎ থাকবে কি? রাস্তায় নিরাপদে চলা যাবে কি? সরকারের সমালোচনা করা যাবে কি? প্রশাসন কি দলীয় প্রভাবের বাইরে থাকবে?
তরুণরা ভোট দিয়ে সরকার বেছে নিয়েছে। এখন তারা ফলাফল দেখতে চায় জীবনে। তাদের কাছে গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সে শেষ হয় না। চাকরির পরীক্ষার হল, বাজারের ব্যাগ, কারখানার বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কথা বলার অধিকার সবখানেই তার প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির টানাপড়েন।





