খালিদ সাইফুল্লাহ

রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট কিংবা ব্যস্ততম মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর- উচ্ছেদ অভিযান শেষ হতে না হতেই ফের পুরনো রূপে ফিরেছে ঢাকার ফুটপাথ ও সড়ক। সিটি করপোরেশনের বুলডোজার আর ভারী গাড়ি ফিরে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দখল হয়ে যাচ্ছে পথচারীদের হাঁটার পথ। উচ্ছেদ, সংঘর্ষ, মালামাল জব্দ এবং ফের দখলের এই পুনরাবৃত্তি ঢাকা শহরের যানজট ও পথচারীদের দুর্ভোগের অন্যতম স্থায়ী কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনিক কঠোর হুঁশিয়ারি ও বারংবার অভিযানের পরও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন নীতি ও স্থায়ী তদারকির অভাবে ফুটপাথ মুক্ত করার সব উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)- উভয় সংস্থাই রাজধানীর ফুটপাথ ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে কঠোর অবস্থান ও জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। তবে হকার ও সাধারণ নাগরিকদের মতে, বিকল্প ব্যবস্থার স্থায়ী নিশ্চয়তা না দিয়ে কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফুটপাথ চিরতরে দখলমুক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
কড়া হুঁশিয়ারি ও উচ্ছেদ অভিযান : দুই সিটির কঠোর বার্তা
ফুটপাথ ও সড়ক দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুস সালাম। সম্প্রতি রাজধানীর ধলপুরে সার্বিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা,  সড়ক থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও জনভোগান্তি সংক্রান্ত বিষয়াদি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন নির্ধারিত ও অনুমোদিত স্থান ছাড়া রাজধানী ঢাকার কোথাও কোনো হকার বসতে দেয়া হবে না। ডিএসসিসি প্রশাসক স্পষ্ট করে জানান, জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাটের মূল সড়কসহ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাথে অবৈধভাবে হকার বসলে মালামাল ক্রোক ও সরাসরি মামলা করা হবে। তিনি আরো বলেন, শহরের সব হকারকে শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে হবে এবং সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত হতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া ঢাকা শহরের কোথাও কোনো হকার বসতে পারবে না। এখন থেকে উচ্ছেদের সাথে সাথে মালামাল জব্দ ও সরাসরি মামলা দায়ের করা হবে।
অন্য দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান ফুটপাথ দখলকারীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, দখলমুক্ত করার এই সংগ্রাম থেমে থাকবে না। জনগণের ফুটপাথ জনগণের জন্যই উন্মুক্ত করা হবে জানিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, কেউ যদি উচ্ছেদের পর আবার বসে, তবে আরো দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কঠোর অবস্থানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।
হকারদের অনীহা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, ডিএনসিসি ইতঃপূর্বে হকারদের সম্মতিক্রমে বিকল্প রাস্তায় ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ডের মাধ্যমে উপার্জনের ব্যবস্থা করেছিল। তবে হকাররা কথা না রেখে পুনরায় মূল রাস্তায় ফিরে এসেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, হকাররা ব্যবসা করবে নির্দিষ্ট স্থানে, ফুটপাথ দখল করে জনদুর্ভোগ তৈরি করে নয়।
বারংবার অভিযান, ফের দখল
ফার্মগেট, গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল ও মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোতে উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফুটপাথে ফের বসে পড়ছে পলিথিন, কাঠ ও বাঁশের তৈরি অস্থায়ী দোকান। উচ্ছেদের পরপরই হকাররা ফের রাস্তায় নেমে এলে এক দিকে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, অন্য দিকে সাধারণ পথচারীরা বাধ্য হচ্ছেন মূল সড়কের ওপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে। রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর মোড়ে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশনের কর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও হকারদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের কড়াকড়ি ও উচ্ছেদ অভিযানের মুখে ঢাকার পরিস্থিতি দিন দিন তাই আরো সহিংস হয়ে উঠছে।
সমস্যার মূল কারণ বিশ্লেষণ
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর ফুটপাথ দখল ও পুনরায় দখল হয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি মৌলিক কারণ কাজ করছে : 
১. সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পুনর্বাসনের অভাব : হকারদের ফুটপাথ থেকে সরিয়ে যে বিকল্প স্থানে পাঠানো হয়, তা নির্ধারণে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। অনেকসময় বিকল্প হিসেবে যে স্থান নির্বাচন করা হয়, সেখানে ক্রেতাদের সমাগম না থাকায় হকাররা লোকসানের মুখে পড়ে আবার মূল সড়কে ফিরে আসেন।
২. হকারদের অনীহা ও নিবন্ধনে বিশৃঙ্খলা : সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত নিয়ম বা সময়সীমা মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হকারদের একটি বড় অংশের অনীহা রয়েছে। আগে দেয়া নিবন্ধনের সুযোগের তোয়াক্কা না করে অনেকেই বেশি লাভের আশায় মূল ফুটপাথে দোকান বসাচ্ছেন।
৩. স্থায়ী তদারকি ও নজরদারির ঘাটতি : উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেই স্থানটি যাতে পুনরায় দখল না হয়, সে জন্য সার্বক্ষণিক মনিটরিং বা পুলিশি পাহারার তীব্র ঘাটতি থাকে। ফলে অভিযান শেষ হতেই পুরনো সিন্ডিকেট ও হকাররা সুযোগ বুঝে স্থানগুলো ফের দখল করে নেয়।
উত্তরণের উপায় : টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার আহ্বান
ঢাকার ফুটপাথকে পুরোপুরি দখলমুক্ত করতে কেবল তাৎক্ষণিক বা বলপ্রয়োগভিত্তিক উচ্ছেদ অভিযান নয়; বরং একটি সুসংগঠিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হকারদের পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার ও নিবন্ধন: প্রতিটি হকারকে ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় এনে নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র ও নির্ধারিত সময়সূচি (যেমন : হলিডে মার্কেট বা নাইট মার্কেট) অনুযায়ী ব্যবসা করার অনুমতি দেয়া।
পরিকল্পিত বিকল্প বাজার : মূল সড়কের ক্ষতি না করে কাছাকাছি সুবিধাজনক স্থানে ‘হকার্স মার্কেট’ বা নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক জোন তৈরি করা, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই সহজে পৌঁছাতে পারে।
জিরো টলারেন্স নজরদারি : উচ্ছেদকৃত স্থানগুলোতে নিয়মিত সিসিটিভি ক্যামেরা ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় সার্বক্ষণিক তদারকি রাখা।
সিন্ডিকেট বিলোপ : ফুটপাথে অবৈধ দোকান বসানো এবং চাঁদাবাজির পেছনে যেসব স্থানীয় প্রভাবশালী ও সিন্ডিকেট কাজ করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
ঢাকার রাজপথ ও ফুটপাথ নাগরিকদের নির্বিঘেœ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা সিটি করপোরেশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রশাসনের এই অনড় অবস্থান যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, হকারদের পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবেই কেবল ঢাকাবাসী ফিরে পেতে পারে তাদের কাক্সিক্ষত নিরাপদ ও দখলমুক্ত ফুটপাথ।