নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ সোমবার যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে প্রতি বছর এ দিনে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত কেন্দ্রীয় উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে দেশের ১০০ জন শিক্ষকের হাতে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চলতি বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘স্ট্যান্ডিং উইথ টিচার্স : সিক্সটি ইয়ার্স অব প্রোটকেটিং দ্য প্রফেশন, অ্যাডভান্সিং ইটস স্ট্যাটাস, শেপিং আওয়ার ফিউচার্স’। এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষকদের মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে এ বছর গুণী শিক্ষক সম্মাননার পরিধি ১২ জন থেকে বাড়িয়ে প্রথমবারের মতো ১০০ জনে উন্নীত করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ১০ জন, মাধ্যমিকে ২০, কলেজে ২৫, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০, মেডিক্যাল কলেজে ১০, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩, বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কোটায় পাঁচজনসহ মোট ১০০ জন শিক্ষককে এবার সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচিত প্রত্যেক শিক্ষককে নগদ দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দেয়া হবে। 
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্যারিসে আয়োজিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সুপারিশমালা গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় এ দিনটিকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিক্ষা ও শিক্ষকদের সার্বিক উন্নয়নে ইউনেস্কোর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। শিক্ষায় বিনিয়োগ জাতীয় প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও ইউনেস্কোর নির্দেশিকা অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে একটি মেধাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এবারের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের প্রধান প্রত্যাশা, তাদের সমস্যাগুলো যেন শুধু আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সময়মতো বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, অবসর সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে। আর সেই শ্রেণিকক্ষের মূল কারিগর শিক্ষক। তাই শিক্ষককে যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেয়া কেবল পেশাগত দাবি নয়, এটি মানসম্মত শিক্ষা এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার মান নিয়ে যত আলোচনা ও পরিকল্পনাই করা হোক, শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, বদলি ও অবসর সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে অনেক শিক্ষকের। অন্য দিকে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সঙ্কট, শূন্য পদ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব শিক্ষার পরিবেশকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। 
অনেক প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের পাঠদান ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে পাঠদানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্যও শিক্ষকদের কাজকে কঠিন করে তুলছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, নতুন শিক্ষাক্রম এবং পরিবর্তিত মূল্যায়ন ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ এবং প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ। এ ছাড়া শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম প্রণয়নে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, যারা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে কাজ করেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত ছাড়া শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না।