শাহ আলম নূর

জ্বালানি সঙ্কট এখন শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সমস্যা নয়, দেশের তৈরি পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। গ্যাসের স্বল্প চাপ, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ে কারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিদেশী ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর মধ্যেই ইউরোপের কয়েকটি বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে কিছু ক্রয়াদেশ কমিয়ে ভারতসহ বিকল্প উৎপাদন গন্তব্যে নেয়ার কৌশল করছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে রফতানি আয়ের প্রধান এই খাতটিতে নতুন করে অর্ডার হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক পোশাক ব্যবসায় বড় ব্র্যান্ডগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন দ্রুত বদলেছে। আগে যেখানে কম শ্রমমূল্য ও বড় পরিমাণে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ক্রয়াদেশ পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত, সেখানে এখন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দ্রুত উৎপাদন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ, পরিবহন সুবিধা এবং সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি সব কিছুকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ক্রেতারা। বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে তাই একই সাথে উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
তারা বলছেন, বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারের কয়েকজন ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে কিছু অর্ডার সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে ভাবছে। উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি সঙ্কট এ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে উদ্যোক্তারা মনে করছেন। একই সময়ে ভারত পোশাক উৎপাদনে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইউরোপীয় বাজারে বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের সরবরাহব্যবস্থায় ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। কোনো একটি দেশের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তারা সরবরাহব্যবস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখছে।
তিনি বলেন, ক্রেতারা একদিকে পণ্যের মান, অন্য দিকে উৎপাদন ব্যয় দুই বিষয়কেই বিবেচনায় নেয়। তাই বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন ক্রেতা আকর্ষণ এবং বিদ্যমান ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি অর্ডার পাওয়ার জন্য শিল্প খাতকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।
ইউরোপের বাজারে পোশাক রফতানি করেন এমন একজন উদ্যোক্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, কয়েকটি বড় ব্র্যান্ডের অর্ডার বাংলাদেশ থেকে ভারতের দিকে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে ভারতের তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং ভবিষ্যতে ভারত-ইইউ বাণিজ্য সম্পর্ক আরো সুবিধাজনক হওয়ার প্রত্যাশা কাজ করছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক একটি ব্র্যান্ডের হয়ে কাজ করা একটি বাইং হাউজ ভারতে নতুন দু’টি অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটিতে ক্রয় কার্যক্রম বাড়ানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
দেশের রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বিষয়টি শুধু অর্ডারের স্থান পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের ধরনও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। কম দামের মৌলিক পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো শক্তিশালী হলেও বেশি মূল্য সংযোজনকারী ও জটিল পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ক্রেতারা উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি দ্রুত ডিজাইন পরিবর্তন এবং দ্রুত বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
বৈশ্বিক ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএমের সরবরাহব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনও এ প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কিছু জটিল ডিজাইনের পোশাক ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি উৎপাদনের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর বাংলাদেশে তুলনামূলক সাধারণ এবং কম দামের পোশাকের উৎপাদন ধরে রাখার প্রবণতা রয়েছে।
এ ধরনের পরিবর্তন বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বড় সতর্কসঙ্কেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এতে দেশের কারখানাগুলো সবচেয়ে কম দামের পণ্যের প্রতিযোগিতায় আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্য দিকে বেশি মূল্য সংযোজনকারী পণ্যে যেতে হলে প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নতুন ধরনের কাঁচামালে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এইচএন্ডএমের এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট অর্ডারের পরিমাণ বা উৎপাদন কমানোর বিষয়ে কোনো সংখ্যা দিতে রাজি হননি। বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে তাদের সরবরাহব্যবস্থা পর্যালোচনা করছে বলে তিনি জানিয়েছেন। 
তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি সরবরাহ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চায়, যা পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম। একই সাথে সরবরাহকারীর সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থানের ক্ষেত্রে কৌশলগত ভারসাম্য রাখার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কমসংখ্যক কৌশলগত অংশীদারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলাও তাদের বর্তমান কৌশলের অংশ।
তবে বাংলাদেশকে এইচঅ্যান্ডএম এখনো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশে প্রায় চার দশকের কার্যক্রম রয়েছে। স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারকদের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও তাদের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অংশ বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
এইচঅ্যান্ডএমের প্রকাশিত সরবরাহকারী তালিকার তথ্যেও পরিবর্তনের চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির জন্য উৎপাদনকারী ইউনিটের সংখ্যা ২০২০ সালের প্রায় ২৩৫টি থেকে সর্বশেষ তালিকায় প্রায় ১৮৯টিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সরবরাহকারী কারখানার সংখ্যা কমেছে কয়েক বছরে।
এদিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে, কারখানার সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশ থেকে এইচঅ্যান্ডএমের পণ্য সংগ্রহের পরিমাণ এখনো উল্লেখযোগ্য। তাদের ধারণা, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের পোশাক সংগ্রহ করে। ফলে কারখানার সংখ্যা কমে যাওয়াকে শুধু অর্ডার কমার সরল হিসাব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণও পোশাক ব্যবসার সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। বর্তমানে বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত বা বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের পোশাক রফতানি অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। উত্তরণের পর এসব সুবিধার কিছু অংশ পরিবর্তিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সাথে বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রফতানিকারকদের জন্য বড় উদ্বেগ।
এর সাথে যোগ হয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের চাপ। গ্যাসের সঙ্কটে উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেলে অনেক কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে। একই সাথে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা উৎপাদন পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে। সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাকের দাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে এমনিতেই চাপ রয়েছে। এর মধ্যে দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, শ্রম, ঋণ, পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত খরচের পুরোটা ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা সম্ভব হয় না। ফলে অর্ডার থাকলেও মুনাফার জায়গা সঙ্কুচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতকে এখন ‘কম খরচের উৎপাদক’ পরিচয়ের বাইরে যেতে হবে। উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পোশাক, জটিল ডিজাইন, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সাথে দক্ষ শ্রমিক তৈরির পাশাপাশি গবেষণা ও নকশা সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অর্ডার ধরে রাখার প্রথম শর্ত হচ্ছে উৎপাদনের পরিবেশ স্থিতিশীল করা। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতার সুবিধাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না। পাশাপাশি বন্দর, কাস্টমস ও পরিবহন ব্যবস্থায় সময় কমানো গেলে বাংলাদেশী পণ্যের লিড টাইম আরো প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব।
রফতানি শিল্পসংশ্লিষ্টরা অবশ্য আশার কথাও বলছেন। তারা বলছেন, এখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে বড় ব্র্যান্ডগুলো ব্যাপকভাবে বাংলাদেশ ছাড়ছে। বরং তারা ঝুঁকি ভাগ করে নেয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের জায়গা হলো এই পুনর্বিন্যাসে নতুন অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারত, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ আগের চেয়ে বেশি সুবিধা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সঙ্কটকে এখন আর শুধু শিল্প উৎপাদনের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গ্যাসের চাপ কমে একটি কারখানায় কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ থাকা মানে শুধু ওই দিনের উৎপাদন ক্ষতি নয়; এর সাথে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি খরচ, ডেলিভারি ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থার প্রশ্ন। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় অর্জন বিশ্ববাজারে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিশ্বের পোশাকবাজার সম্পর্কে বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী লড়াই। একদিকে জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্কট কাটিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখতে হবে, অন্য দিকে কম দামের সাধারণ পোশাকের বাইরে গিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজারে প্রবেশ করতে হবে। সময়মতো এই রূপান্তর ঘটাতে না পারলে বড় ব্র্যান্ডগুলোর অর্ডার পুনর্বিন্যাসের বর্তমান প্রবণতা আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য আরো বড় বাজারঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।