নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম তোপখানা রোড ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের প্রধান সড়ক সোমবার সকালে হঠাৎই পরিণত হয় এক উত্তপ্ত জনসমুদ্রে। মাইকের কর্কশ আওয়াজ, প্লাকার্ডের মিছিল এবং ‘ভাত দে! কাপড় দে! নইলে অটো চলতে দে!’ স্লোগানে কাঁপছিল তোপখানা ও পল্টন এলাকা। বিভিন্ন গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া, ট্রাফিক পুলিশের ডাম্পিং এবং আটক চার নেতার মুক্তির দাবিতে গতকাল সোমবার সকাল থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক ও মালিক ঐক্য পরিষদ অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়। এর ফলে স্থবির হয়ে যায় তোপখানা রোড, পল্টন, দৈনিক বাংলা, মগবাজারসহ একাধিক মূল সড়ক ও অলিগলি। এ সময় কাকরাইল মোড়সহ বেশ কিছু জায়গায় বাসে হামলা চালায় আন্দোলনকারীরা। 
গতকাল সকাল থেকেই সাইন্সল্যাব, শাহবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, মালিবাগ, খিলগাঁও, মতিঝিল, মিরপুর, তেজগাঁও, আগারগাঁও ও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। যেসব যাত্রী প্রতিদিন স্বল্প দূরত্ব যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, তারাও পড়েন বিপাকে। রাস্তায় গণপরিবহনের জন্য সৃষ্টি হয় হাহাকার। ভোগান্তির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় বিক্ষোভকারী অটোরিকশা চালকরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে রাজধানীর সড়কগুলোতে মহড়া দেয়ায়। প্রেস ক্লাবের সামনে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সড়ক পুরোপুরি অবরুদ্ধ থাকায় আশপাশের বহু রাস্তায় শত শত যানবাহনের দীর্ঘ জট সৃষ্টি হয়। তীব্র রোদের মধ্যে অফিসগামী চাকরিজীবী, বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল অভিমুখে যাওয়া রোগীরা হেঁটে গন্তব্যের দিকে ছোটেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি এস এম আবুবকর সিদ্দিক এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা চার দফা দাবি তুলে ধরে জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ‘রোড পারমিট’ প্রদান করতে হবে। অটোরিকশা চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। অভিজ্ঞ চালকদের জন্য সরকারি ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স’ ইস্যু করতে হবে। অটোরিকশার গ্যারেজগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং আটককৃত রিকশা ডাম্পিং করা বন্ধ করতে হবে।
সমাবেশ থেকে সরকারকে ব্যাটারিচালিত রিকশা উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ এবং কারারুদ্ধ চার নেতার নিঃশর্ত মুক্তির জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়া হয়। ক্ষুব্ধ নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানোর চেষ্টা করবেন না; যদি আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে না নেয়া হয়, তবে কেবল প্রেস ক্লাব নয়, পুরো ঢাকা রাজপথ অবরুদ্ধ করে অচল করে দেয়া হবে।
জানা যায়, রাজধানী ও এর আশপাশের বিভিন্ন গ্যারেজে দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ দেয়া হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ডেসকো ও ডিপিডিসিসহ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযানে বেশ কিছু গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়ায় রিকশা চালকরা ভিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে।
চালকদের অভিযোগ, রাস্তায় বের হলেই ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ডাম্পিংয়ের নামে তাদের আটক করে এক হাজার ২০০ টাকা থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও অর্থ আদায় করে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি সবুজবাগ থানা এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নে বাধাদানের অভিযোগে চার অটোরিকশা নেতাকে পুলিশ আটক করে সাজা প্রদান করে এবং ডাম্পিং নিশ্চিত করে। এভাবে গ্যারেজের বিদ্যুৎ কেটে দেয়া ও ডাম্পিং করার ফলে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করেছে। সাধারণ রিকশার বডিতে মোটর ও শক্তিশালী ব্যাটারি বসিয়ে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বা তারও বেশি গতিতে ছোটানো এসব যান প্রায়ই বেপরোয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং প্রধান সড়কে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটায়। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, হুটহাট ইউ-টার্ন নেয়া, ওভারটেকিং এবং ভিআইপি রুট বা প্রধান সড়কে ঢুকে পড়ার কারণে প্রতিদিন রাজধানীর মূল সড়কগুলোতে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া হাজার হাজার গ্যারেজে চোরাই বা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে প্রতিদিন এই কোটি কোটি ব্যাটারি চার্জ করা হয়, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিপুল অপচয় ঘটায় এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে।