হাবিবুল বাশার

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে চলছে মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক ইসলামী বইমেলা-২০২৬। দেশী-বিদেশী ২০৬টি প্রতিষ্ঠান এবং ১৪৪টি স্টলের এ আয়োজনে ছুটির দিনে দর্শনার্থীর উপস্থিতি বাড়লেও প্রত্যাশা অনুযায়ী পাঠক-দর্শনার্থী হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মূলধারার গণমাধ্যমে মেলার পর্যাপ্ত প্রচার না হওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমিত প্রচারণা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনের কথা বলছেন প্রকাশক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা: ১৪৪৮ হিজরি উপলক্ষে গত ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এ মেলা। মেলা রোববার থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং শুক্র ও শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। চলবে আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। বাংলাদেশ ছাড়াও মিসর, লেবানন, পাকিস্তান ও ভারত থেকে সাতটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, দুপুরের পর থেকেই বইপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পায় মেলা প্রাঙ্গণ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বিভিন্ন স্টলে বাড়তে থাকে ভিড়। কেউ একা, কেউ বন্ধুদের সাথে, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরছেন স্টলে স্টলে। বইয়ের প্রচ্ছদ দেখার পাশাপাশি পাতা উল্টে বিষয়বস্তু যাচাই করে পছন্দের বই কিনছেন অনেকে।
মেলার স্টলগুলোতে কুরআনের অনুবাদ, তাফসির, হাদিস, সিরাত, ইসলামী দর্শন, ইতিহাস, গবেষণা ও ধর্মীয় সাহিত্যসহ নানা বিষয়ের বই রয়েছে। শিশু-কিশোরদের জন্যও রয়েছে বিভিন্ন ইসলামী ও শিক্ষামূলক প্রকাশনা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবন ও আদর্শভিত্তিক সিরাতের বই ঘিরে দর্শনার্থীদের বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে।
তবে মেলায় আসা দর্শনার্থীদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ আয়োজন সম্পর্কে অনেকেই দেরিতে জানতে পারছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ মনে করেন, মেলার যতটুকু প্রচার হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। তার মতে, কওমি অঙ্গন ও ইসলামী চিন্তার মানুষের মধ্যেও অনলাইনে মেলার প্রচারণা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। অনেকেই পল্টন এলাকায় যাতায়াত বা পরিচিতজনের মাধ্যমে মেলার খবর পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, বড় কোনো নেতা বা কওমি আলেম মেলায় এলে সাময়িকভাবে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে মেলার তথ্য পৌঁছাচ্ছে না। একুশে ফেব্রুয়ারির বইমেলার সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, ওই মেলার দীর্ঘদিনের পরিচিতি ও ব্যাপক প্রচারণার কারণে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়। ইসলামী বইমেলায় সে ধরনের সর্বজনীন পরিবেশ ও প্রচার নেই।
টাইমস টু ডের সাংবাদিক আহমেদ নাঈমও মেলার প্রচার-প্রচারণার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বইকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কম। পাশাপাশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এ আয়োজনের প্রচারে এক ধরনের অবহেলা রয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও সংবাদমাধ্যমকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
মেলার একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী জানান, তাদের দৈনিক গড় বিক্রি ১০ হাজার টাকারও কম। তার মতে, পর্যাপ্ত প্রচার না হওয়া এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে বই বিক্রিতে প্রভাব পড়ছে। শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ মোবাইল ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে সময় কাটানোর কারণে মুদ্রিত বইয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ ও সময় কমছে বলেও মনে করেন তিনি। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম বলে জানান তিনি।
তবে অন্য কয়েকজন প্রকাশকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। অনলাইনভিত্তিক পড়াশোনা, স্মার্টফোনে বইয়ের পিডিএফ ও ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তারের কারণে মুদ্রিত বইয়ের পাঠক কিছুটা কমলেও সরাসরি বইমেলায় এসে বই দেখা ও কেনার আগ্রহ এখনো রয়েছে।
মেলায় অংশ নেয়া মাকতাবাতুল আসলাফের বিক্রেতা হাসান বলেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা কম হলেও প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি এর বেশি বই বিক্রি হচ্ছে। তবে ছুটির দিনগুলোতে বিক্রি দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যায়। মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিই তুলনামূলক বেশি বলে জানান তিনি।
বইমেলায় বিক্রি আশানুরূপ নয় বলে জানিয়েছেন তালবিয়া প্রকাশনীর আবু সিদ্দিক। তার মতে, মেলায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার সাধারণ মানুষ গেলেও নির্দিষ্ট কিছু পাঠকগোষ্ঠীর উপস্থিতি কম থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীগুলোর বই বিক্রিতে তার প্রভাব পড়ছে। বইমেলার বেচাকেনার বিষয়ে জানতে চাইলে আবু সিদ্দিক বলেন, ‘বেচাকেনা খুব একটা ভালো না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মেলায় সাধারণ মানুষ ও কওমি অঙ্গনের কিছু মানুষ গেলেও তাদের প্রকাশনীর নিয়মিত পাঠকগোষ্ঠীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। 
তিনি জানান, বর্তমানে কোনো কোনো দিন এক হাজার, দেড় হাজার, দুই হাজার কিংবা তিন হাজার টাকার মতো বই বিক্রি হচ্ছে। তার ভাষ্য, বইয়ের বিক্রি অনেকাংশে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীর পাঠক ও ক্রেতারা মেলায় কতটা উপস্থিত হচ্ছেন তার ওপর। তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ব্যস্ততার কারণে সংশ্লিষ্ট অনেক মানুষের নিয়মিতভাবে বইমেলায় ঘোরাফেরা বা কেনাকাটার সুযোগও কমেছে। 
মেলায় আসা যাত্রাবাড়ীর জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদরাসার দাওরা বিভাগের শিক্ষার্থী ফায়েজ আহমেদ প্রায় দেড় হাজার টাকার বই কিনেছেন। তিনি বলেন, শুধু মুসলিম বা ইসলামী ঘরানার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বজনীনভাবে সবাইকে মেলার সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মেলায় আনা গেলে পাঠকসংখ্যা বাড়তে পারে।
শাপলা কর্নারে ২০১৩-এর স্মৃতি
এবারের মেলায় নতুন সংযোজন হিসেবে রাখা হয়েছে ‘শাপলা কর্নার’। ২০১৩ সালের মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ছবি, তথ্য ও স্মৃতির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। আয়োজকদের ভাষ্য, সে সময়ের ঘটনাবলি এবং রাসূলপ্রেমের চেতনা থেকে মানুষের রাজপথে অবস্থানের স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এ কর্নারের উদ্দেশ্য।
কওমি মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা রাহাত বলেন, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাগুলো তিনি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। মেলায় সেই স্মৃতি নতুন করে সামনে আসায় পুরনো ঘটনাগুলো তার মনে ভেসে উঠছে। তার মতে, এটি মেলার একটি আকর্ষণীয় আয়োজন।
সিরাত এক্সিবিশনে নবীজীবনের প্রতীকী উপস্থাপন
মেলার অন্যতম আকর্ষণ ওয়াফা হিফজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের আয়োজনে সিরাহ এক্সিবিশন। এখানে মহানবী সা:-এর শৈশব, কৈশোর, ইসলামপূর্ব আরবের সামাজিক ব্যবস্থা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ এবং তার জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় প্রতীকী উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে।
শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম বলেন, প্রদর্শনীতে মহানবী সা:-এর বাসস্থানের একটি ত্রিমাত্রিক মডেল উপস্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ জীবনযাপনের বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি এ মডেল তার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় লেগেছে।
সন্তানকে নিয়ে সিরাহ এক্সিবিশনে আসা স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ছোটদের সামনে মহানবী সা:-এর জীবনের কিছুটা হলেও তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার জীবনাদর্শ সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই জানা ও তা অনুসরণ করার গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
মেলায় নারী কর্নার, শিশু কর্নার, সিরাত কর্নার, ম্যাগাজিন কর্নার ও লিটল ম্যাগ কর্নার রয়েছে। মাসব্যাপী আয়োজনে আলোচনা সভা, ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য রয়েছে মিডিয়া কর্নার ও তথ্যকেন্দ্র। নারীদের জন্য রাখা হয়েছে পৃথক বসার ব্যবস্থা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও ঢাকার বাইরে থেকেও পাঠক ও বইপ্রেমীরা মেলায় আসছেন। মেলার পূর্ব গেট এলাকায় তুলনামূলক বেশি ভিড় দেখা গেছে। পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও চোখে পড়েছে।
জুলাই কর্নার
বায়তুল মোকাররম ইসলামী বইমেলায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এবার তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই কর্নার’। সাধারণ আলেম সমাজের প্রস্তুত করা মাদরাসাশিক্ষার্থী ও আলেম শহীদদের ৮৫ জনের তালিকা এবং একনজরে তাদের পরিচিতি দিয়ে কর্নারটি সাজানো হয়েছে। উদ্বোধনের পর থেকেই কর্নারে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং শহীদদের নিয়ে বই পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক ইসলামী বইমেলা আয়োজকদের একজন সাজ্জাদ হোসেন রাকিব বলেন, ২০২৩ সালের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার প্রভাব দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব সারা বছরের বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি ইসলামী বইমেলাতেও পড়েছে।
মেলায় সংবাদমাধ্যমের কাভারেজ কম হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিছু মিডিয়া হাউজ থেকে প্রতিনিধিরাও এসেছেন। তবে যেভাবে মেলার প্রচার ও কভারেজ হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরো ব্যাপক প্রচার হলে মেলায় সাধারণ পাঠকের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। 
তিনি বলেন, সিরাতুন্নবী সা: উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় ধর্মীয় বইয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় মূলত কওমি ঘরানার পাঠকদের উপস্থিতিই বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে কিছুসংখ্যক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীকেও মেলায় আসতে দেখা যায়। প্রচার-প্রচারণা আরো বেশি হলে তাদের উপস্থিতি বাড়ত বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
পরিচিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ প্রকাশকের বিক্রি সন্তোষজনক নয় বলেও জানান সাজ্জাদ হোসেন রাকিব। তিনি বলেন, অনেক প্রকাশকের বই তেমন বেচাকেনা হচ্ছে না। প্রকাশকরাও বইমেলায় বিক্রির বিষয়ে সন্তোষজনক অবস্থার কথা জানাননি। তুলনামূলকভাবে এবার বিক্রি অনেক কম হচ্ছে। প্রচার-প্রচারণা বেশি হলে জমে উঠত আন্তর্জাতিক ইসলামী বইমেলা।