বিশেষ সংবাদদাতা 

রেমিট্যান্সের প্রবাহে গতি ফিরলেও এর উৎসের চিত্রে দেখা দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস সৌদি আরব থেকে আগস্টে রেমিট্যান্স কমেছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও ইতালি থেকে প্রবাহ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও আগস্টে জুলাইয়ের তুলনায় কিছুটা কম অর্থ এসেছে। ফলে মোট রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও এর ভেতরে কোন শ্রমবাজার কতটা অবদান রাখছে, সেই সমীকরণে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। 
গতকাল সোমবার প্রকাশ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মাসিক রেমিট্যান্স রিপোর্ট-আগস্ট ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। জুলাইয়ে এসেছিল ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার; অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রবাহ বেড়েছে ১০ কোটি ৮৮ লাখ ডলার বা ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। 
তবে মোট প্রবাহের ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে উৎসভিত্তিক ওঠানামা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। 
সৌদি আরবের প্রবাহে পতন 
আগস্টেও সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটি থেকে এসেছে ৫৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। কিন্তু জুলাইয়ে সৌদি আরব থেকে এসেছিল ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার; অর্থাৎ এক মাসে কমেছে প্রায় দুই কোটি ৮৭ লাখ ডলার। 
তবু জুলাই-আগস্ট দুই মাস মিলিয়ে সৌদি আরব থেকেই এসেছে ১১৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ফলে একক দেশ হিসেবে সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। 
সৌদি আরবের প্রবাহে মাসভিত্তিক ওঠানামা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী দেশটিতে কর্মরত থাকায় দেশটির শ্রমবাজারের আয়-ব্যয়, কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কর্মীদের দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতার পরিবর্তন সরাসরি সামগ্রিক রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলে। 
যুক্তরাজ্য থেকে প্রবাহে বড় উত্থান 
সৌদি আরবের বিপরীতে যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্সে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। আগস্টে যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ৪৫ কোটি ৮১ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এসেছিল ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এক মাসে বেড়েছে প্রায় ছয় কোটি ১৪ লাখ ডলার। দুই মাসে যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ৮৫ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। ফলে রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে যুক্তরাজ্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। 
যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আগস্টে এসেছে ২৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে জুলাইয়ের ২৭ কোটি ৩২ লাখ ডলারের তুলনায় এটি সামান্য কম। দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৫৪ কোটি দুই লাখ ডলার। 
মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র একরকম নয় 
বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান ভিত্তি ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু আগস্টের তথ্য বলছে, এ অঞ্চলের সব বাজারে একই ধরনের প্রবণতা নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আগস্টে এসেছে ২৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলার, যা জুলাইয়ের ২৫ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের চেয়ে কিছুটা কম। অন্য দিকে কুয়েত থেকে এসেছে ১৪ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, ওমান থেকে ১৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং কাতার থেকে ১১ কোটি ৩১ লাখ ডলার; অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের বড় শ্রমবাজারগুলো থেকে এখনো বিপুল অর্থ আসছে, কিন্তু মাসভিত্তিক প্রবাহে ওঠানামা রয়েছে। 
নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে মালয়েশিয়া ও ইতালি 
রেমিট্যান্সের উৎসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি দেখা যাচ্ছে মালয়েশিয়া ও ইতালিতে। মালয়েশিয়া থেকে আগস্টে এসেছে ২২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এসেছিল ২০ কোটি ১৩ লাখ ডলার। এক মাসে বেড়েছে প্রায় দুই কোটি ৭৪ লাখ ডলার। দুই মাসে দেশটি থেকে এসেছে ৪৩ কোটি চার লাখ ডলার। 
ইতালি থেকেও আগস্টে এসেছে ২১ কোটি ২৫ লাখ ডলার, যেখানে জুলাইয়ে ছিল ২০ কোটি ৩১ লাখ ডলার। দুই মাসে ইতালি থেকে এসেছে ৪১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের উৎস শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর থাকছে না; ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু বাজারও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। 
শীর্ষ উৎসের তালিকায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত 
আগস্টের হিসাবে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের শীর্ষ উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ইতালি। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, ওমান ও কাতার। উৎসভিত্তিক এই চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ শুধু মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিয়ে প্রবাসী আয়ের শক্তি বিচার করলে শ্রমবাজারের ভেতরের পরিবর্তন ধরা পড়ে না। কোনো একটি দেশে প্রবাহ কমলেও অন্য দেশ থেকে বাড়তি অর্থ এসে মোট প্রবাহকে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে পারে। 
আগস্টের তথ্য সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মাসভিত্তিক প্রবাহ কমেছে; বিপরীতে যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও ইতালি থেকে বেড়েছে। 
দুই মাসে ৫৮২ কোটি ডলার 
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৫৮২ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪৮৯ কোটি ৯৮ লাখ ডলার; অর্থাৎ দুই মাসে প্রবাহ বেড়েছে ৯২ কোটি ৬৫ লাখ ডলার বা ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে রেমিট্যান্সকে বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবাসী আয় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে। তবে প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নির্ভর করছে শুধু প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর ওপর নয়; বরং বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বিস্তার ও বৈচিত্র্যের ওপরও। 
সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স কমেছে ৬.৭৮ শতাংশ  
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ২৭৬ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স কমেছে ২০ কোটি ১২ লাখ ৯০ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬.৭৮ শতাংশ। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় আয় বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক সিরিজ অনুযায়ী, আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এসেছিল ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ফলে এক দিকে মাসিক প্রবাহে কিছুটা ছন্দপতন হলেও বছরওয়ারি হিসাবে প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। 
সেপ্টেম্বরের দেশভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ রেমিট্যান্স হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে সেপ্টেম্বরের মোট প্রবাহ থেকে কোন দেশ কত অবদান রেখেছে; তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে বড় কয়েকটি শ্রমবাজারের ভূমিকা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা সামগ্রিক প্রবাহকে প্রভাবিত করছে। সেপ্টেম্বরে মাসিক পতনটি তাই নজরকাড়া হলেও বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে প্রবাসী আয় এখনো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভরসা। 
ব্যাংকিং চ্যানেলেও কেন্দ্রীভূত প্রবাহ 
উৎস দেশের পাশাপাশি কোন ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসছে, সেখানেও একটি কেন্দ্রীভবনের চিত্র রয়েছে। আগস্টে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২২৩ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৪৩ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার এবং বিদেশী ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র ৬৭৪ লাখ ডলার। একক ব্যাংক হিসেবে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মাধ্যমেÑ ৫৫ কোটি ৯ লাখ ডলার। এরপর বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ২৯ কোটি ১৯ লাখ এবং ব্র্যাক ব্যাংক ২৫ কোটি ২৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। 
সামনে বড় প্রশ্নÑ কোন শ্রমবাজারে নির্ভরতা বাড়বে? 
বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য উৎস দেশের বৈচিত্র্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগস্টের তথ্য দেখাচ্ছে, পুরনো বড় বাজারগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও ইতালির মতো বাজারও প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এক কোটি ৮৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ বিদেশে কাজের জন্য নিবন্ধন বা সংশ্লিষ্ট অনুমোদন পেয়েছেন। বিপুল এই প্রবাসী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় ভিত্তি। 
কিন্তু একক কয়েকটি দেশের শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোনো দেশে কর্মসংস্থান কমে গেলে, অভিবাসননীতি কঠোর হলে কিংবা প্রবাসী আয়ের প্রবাহে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব দ্রুত সামগ্রিক রেমিট্যান্সে পড়তে পারে। 
তাই আগস্টের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা শুধু প্রবাহ বেড়েছেÑ এটি নয়; বরং উৎসের ভেতরে একটি পুনর্বিন্যাস চলছে। সৌদি আরব এখনো শীর্ষে থাকলেও যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও ইতালির মতো বাজারের বাড়তি অবদান বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ কাঠামোকে আরো বহুমুখী করার সম্ভাবনা তৈরি করছে। 
এই প্রবণতা ধরে রাখতে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর সুযোগ আরো কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি কোথা থেকে সেই অর্থ আসছেÑ সেটিই এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।