নোয়াখালী অফিস

হঠাৎ করে তীব্র গ্যাসসঙ্কটে পড়েছে নোয়াখালীর সব সিএনজি স্টেশন ও শিল্পকারখানা। রোববার সকাল থেকে জেলার সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় শত শত যানবাহন দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জ্বালানি নিতে পারেনি। এতে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও যাত্রীদের পাশাপাশি গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোও চরম বিপাকে পড়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের অনেক এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। নোয়াখালীর সব ক’টি সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। 
গত রোববার সকাল ৮টা থেকে মূলত গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর আগে শনিবার রাতেও হঠাৎ করে প্রায় তিন ঘণ্টার জন্য গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সকাল থেকে বেগমগঞ্জ, চৌমুহনীসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনে শত শত যানবাহন অপেক্ষা করতে দেখা যায়। গ্যাস না পেয়ে চালকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গ্যাসসঙ্কটের কারণে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ সিএনজি স্টেশন, সেতু সিএনজি স্টেশন, আমিন সিএনজি স্টেশন, ফিডার সিএনজি স্টেশন, মিম সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। একই সাথে লক্ষ্মীপুর জেলার শাহী সিএনজি স্টেশনসহ ছোট-বড় শিল্পকারখানায়ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
১৫ মিলিয়নের জায়গায় মিলছে ৬ মিলিয়ন ঘনফুট
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ডিজিএম মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকেই মূলত গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন এ অঞ্চলের জন্য প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সঙ্কট তীব্র হয়েছে। তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, যমুনার সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ দিতে গিয়ে সরকারের নির্দেশে এ অঞ্চলের সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
অন্য দিকে স্থানীয় গ্যাস বিতরণ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের তীব্র সঙ্কট সামাল দিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরসহ এ অঞ্চলে সরবরাহ সীমিত রাখা হয়েছে। সঙ্কট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। 
আগেও পাইপলাইন লিকেজে ভুগেছে অঞ্চলটি
নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। গত আগস্টে বেগমগঞ্জের কেন্দুরবাগ এলাকায় পানির নিচে থাকা গ্যাস পাইপলাইনে লিকেজ দেখা দিলে লক্ষ্মীপুরের পুরো এলাকা এবং নোয়াখালীর শিল্পাঞ্চল ও কয়েকটি সিএনজি স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তখন প্রায় ৭ হাজার ১৫০ আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক এবং চারটি সিএনজি স্টেশন সঙ্কটে পড়েছিল। 
ওই ঘটনায় পাইপলাইনটি পানির প্রায় ১০ ফুট নিচে থাকায় মেরামতকাজ জটিল হয়ে পড়েছিল। পরে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এড়িয়ে বাইপাস লাইন তৈরির মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয় বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। 
এবারের সঙ্কট অবশ্য স্থানীয় পাইপলাইন লিকেজের চেয়ে বড় জাতীয় সরবরাহ ঘাটতির সাথে সম্পর্কিত বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
জাতীয় পর্যায়েও গ্যাসের ঘাটতি
নোয়াখালীর বর্তমান সঙ্কটকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর আগে দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। তখন জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ প্রায় ২,১৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ। এর প্রভাবে সিএনজি স্টেশন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিক গ্রাহকÑ সব শ্রেণীর ভোক্তাই সঙ্কটে পড়ে। 
তবে বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে পেট্রোবাংলা কিছুটা আশ্বস্ত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, অক্টোবর ও নভেম্বরের জন্য ১৯ কার্গো এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছেÑ অক্টোবরে ১০টি এবং নভেম্বরে ৯টি। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, এ দুই মাসে এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা নেই। 
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় পর্যায়ে এলএনজি কার্গো নিশ্চিত থাকার পরও নোয়াখালী-ফেনী-লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে কেন সরবরাহ এতটা কমে যাচ্ছে। এর উত্তর খুঁজতে শুধু এলএনজি আমদানি নয়, জাতীয় গ্রিডের বণ্টনব্যবস্থা, আঞ্চলিক পাইপলাইন সক্ষমতা এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস বরাদ্দের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
স্থানীয় গ্যাস আছে, তবু সঙ্কট কেন?
নোয়াখালীর নিজস্ব গ্যাসসম্পদ নিয়েও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাপেক্স সেনবাগের বড় চারিগাঁও এলাকায় ‘সুন্দরপুর-৪’ নামে একটি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে এখান থেকে দৈনিক ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। কূপটির লক্ষ্যমাত্রিক গভীরতা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিটার। 
বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরপুর গ্যাসক্ষেত্রের আগের কূপগুলোর মধ্যে সুন্দরপুর-২ থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। সুন্দরপুর-১ ও ৩-এর উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ২০১৩ সালে বেগমগঞ্জে খনন করা একটি কূপ থেকেও বর্তমানে প্রায় ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। অর্থাৎ নোয়াখালীতে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক চাহিদা পূরণে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। স্থানীয় উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডের সরবরাহের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে সঙ্কট আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় নোয়াখালী ও আশপাশের শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে কাঁচামাল, শ্রমিক ব্যয়, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করেও উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে। 
অন্য দিকে সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকায় পরিবহন খাতেও সরাসরি প্রভাব পড়ছে। যেসব যানবাহন সিএনজিনির্ভর, সেগুলোর বিকল্প জ্বালানিতে যেতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদেরও দুর্ভোগ বাড়ে। এ দিকে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সুন্দরপুর-১, ২ ও ৩ নম্বর গ্যাসক্ষেত্র থেকে কিছু পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় আবাসিক গ্রাহক সামান্য গ্যাস পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নÑ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতি, আঞ্চলিক বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা নাকি বিতরণ অবকাঠামোর দুর্বলতাÑ কোন কারণে নোয়াখালীর মতো গ্যাসসমৃদ্ধ একটি অঞ্চলের সব সিএনজি স্টেশন একসাথে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এর কারণ নির্ধারণ ও স্থায়ী সমাধান না হলে পরিবহন ও শিল্পের পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও আরো বাড়তে পারে।