বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিদেশ থেকে আইনজীবী হিসেবে যোগ্যতা অর্জনকারীদের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বারে ব্যারিস্টার হিসেবে প্রবেশের প্রক্রিয়ায় সাময়িক কড়াকড়ি আরোপ করেছে যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড (বিএসবি)। এখন থেকে বিদেশী আইনজীবীরা কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বারে স্থানান্তরের জন্য নতুন আবেদন করতে পারবেন না। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাস্তবে আইন পেশায় প্রবেশের নিশ্চিত পথ রয়েছেÑ এমন প্রমাণ দেখাতে পারলে তবেই কেবল নতুন আবেদন গ্রহণ করা হবে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিএসবি এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সংস্থাটি জানায়, প্রচলিত নিয়মের আওতায় বিপুলসংখ্যক যোগ্য আইনজীবীদের স্থানান্তরের (টিকিউএল) আবেদন জমা পড়েছে। তবে আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে প্র্যাকটিস করেন না। ফলে আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।
দুই ধরনের সুযোগ : নতুন বিধিনিষেধের অর্থ
অবশ্য বিদেশী আইনজীবীদের জন্য ব্রিটিশ বারে প্রবেশের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বিএসবি জানিয়েছে, বর্তমানে কেবল সেই বিদেশী আইনজীবীদের টিকিউএল আবেদন গ্রহণ করা হবে, যারা নির্দিষ্টভাবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
এর মধ্যে প্রথমত, কোনো অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে ছাত্র করার অফার থাকতে হবে এবং সেই প্রশিক্ষণ ২০২৯ সালের ১ জানুয়ারির আগে শুরুর কথা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমন টেন্যান্সি অথবা চাকরির অফার থাকতে হবে, যে পদে কাজ করার জন্য ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস বারের অনুশীলনের প্রশংসাপত্র প্রয়োজন; অর্থাৎ শুধু বাংলাদেশ, ভারতে বা পাকিস্তানে আইনজীবী হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করে ইংল্যান্ডের বারে ‘কল’ পাওয়ার জন্য আবেদন করার আগের পথটি আপাতত বন্ধ। বিএসবি বলছে, তাদের লক্ষ্য হলো এমন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া, যাদের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সত্যিকার অর্থে ব্যারিস্টার হিসেবে কাজ করার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
আবেদনের বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়া থেকে
বাংলাদেশের আইনজীবীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিএসবির ২০২৩-২৪ সালের তথ্যানুযায়ী, ওই সময়ে টিকিউএল হিসেবে ৫৮৬টি আবেদন জমা পড়ে। এর অর্ধেকের বেশি এসেছিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে। ওই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৫০টির বেশি নতুন আবেদন জমা পড়ছিল।
ব্রিটিশ আইনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লিগ্যাল ফিউচার্সের আগের প্রতিবেদনগুলোতেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আবেদন বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে বিএসবির কাছে প্রায় ৬৫০টি বিদেশী আইনজীবীর আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। ২০২৪ সালে বোর্ডের বৈঠকে বিদেশী আইনজীবীদের আবেদনের বড় চাপ নিয়ে আলোচনা হয়।
সাম্প্রতিক তথ্যেও আবেদনের চাপের চিত্র স্পষ্ট। বিএসবির ২০২৬ সালের বোর্ড নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাত শতাধিক টিকিউএল আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে; যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ এবং ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ।
নিয়মের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন
টিকিউএল-ব্যবস্থা মূলত বিদেশ থেকে যোগ্যতা অর্জনকারীদের প্রয়োজনীয় ছাড় বা সমমর্যাদা নির্ধারণের মাধ্যমে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বারে প্রবেশের সুযোগ দেয়ার জন্য তৈরি। তবে বিএসবির বর্তমান মূল্যায়ন হলো ব্যবস্থাটি এমন আবেদনও আকর্ষণ করছে যাদের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্র্যাকটিস করার বাস্তব পরিকল্পনা নেই। বিএসবি বলছে, বহু আবেদনকারী মূলত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কিছু ধাপ থেকে অব্যাহতি নিয়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বারে ‘কল’ পেতে চান। তবে তাদের খুব সামান্য অংশই পরে এই এখতিয়ারে আইন পেশায় প্রবেশ করেন। এর ফলে এমন একটি প্রক্রিয়ায় বিপুল প্রশাসনিক সম্পদ ব্যয় হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশী যোগ্য আইনজীবীদের বাস্তবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্র্যাকটিসের সুযোগ করে দেয়া।
সংস্থার মহাপরিচালক ফিল গোল্ডিং বলেছেন, নতুন পদ্ধতির উদ্দেশ্য কাউকে নিরুৎসাহিত করা নয়; বরং যাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ইংল্যান্ড-ওয়েলসে প্র্যাকটিস করার বাস্তব পথ আছে, তাদের আবেদনে অগ্রাধিকার দেয়া। একই সাথে পুরনো আবেদনের জট কমানোই এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশের আইনজীবীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটিশ বারে ব্যারিস্টার হওয়াকে পেশাগত মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ফলে নতুন সিদ্ধান্তটি বিশেষ করে তাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ, যারা বাংলাদেশে আইন পেশায় যুক্ত থেকে পরবর্তীতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বারে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছিলেন।
তবে এরই মধ্যে শুরু করা আবেদনও পুরোপুরি বাতিল হচ্ছে না। বিএসবি জানিয়েছে, মাইবারে শুরু করা কিন্তু এখনো জমা না দেয়া আবেদন সংরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে নতুন করে আবেদন গ্রহণ শুরু হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা সেখান থেকেই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারবেন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো মামলায় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আদালতে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন হলে বিদেশী আইনজীবীদের জন্য বারে সাময়িক ডাকের ব্যবস্থা বহাল রয়েছে; অর্থাৎ পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশ বারে স্থানান্তরের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ নির্দিষ্ট মামলায় বিদেশী আইনজীবীর উপস্থিতির সুযোগ বন্ধ করেনি। বিএসবি এখন বিদ্যমান নিয়ম ও টিকিউএল প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে। নতুন আবেদন গ্রহণের এই সাময়িক বিরতি কত দিন চলবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। ফলে বাংলাদেশের আইনজীবীদের জন্য আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেÑ শুধু বিদেশী যোগ্যতা নয়; ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাস্তবে প্র্যাকটিসের নিশ্চিত পথও থাকতে হবে।





