নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, নাগরিকদের জন্য শুধু একটি ঘর নয় বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও মৌলিক সেবা-সুবিধাসম্পন্ন বাসস্থান নিশ্চিত করাই বর্তমান বিএনপি সরকারের লক্ষ্য। বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত, নিরাপদ ও মৌলিক সেবা-পরিষেবা সম্বলিত বাসস্থান নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং এ অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গতকাল সোমবার সকালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬-এর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
দেশে পরিকল্পিত-পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ গড়ে তুলতে প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।  নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য বাসযোগ্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থাও গুরুত্বের সাথে সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন নিশ্চিত করা  এবং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থান সুবিধা প্রদান বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার। এর ফলে একদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলার মাধ্যমে  জাতিসঙ্ঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির ১১ নম্বর অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে। 
মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের লবিতে তিন দিনব্যাপী আবাসন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলায় আবাসন ও নির্মাণ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দফতর ও সংস্থা অংশ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন,  বাংলাদেশের শহর বন্দর নগরে প্রতিনিয়ত মানুষের বসতি ও বসবাস বেড়েই চলছে। অস্বীকার করার উপায় নেই বর্তমানে রাজধানী ঢাকা ওভার পপুলেটেড। দেশের অন্যান্য শহরগুলোতেও প্রায় একই অবস্থা। শহরাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি মানুষের বসবাস।  এমন বাস্তবতায় সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ গড়ে তোলা জরুরি। 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব বসতি দিবসের অর্থ শুধু একটি ঘর নয়, আরো অনেকগুলো বিষয় এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।   টেকসই আবাসন এর অর্থ সাধারণত আমরা যেটি বুঝি, সেটি হলো নিরাপদ পানি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, গণপরিবহন এবং উন্নত সড়ক ব্যবস্থাপনা  শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সুবিধা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান  সর্বোপরি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ। সব নাগরিকের জন্য এমন একটি নিরাপদ এবং টেকসই বাসস্থান নিশ্চিত করা উন্নত বিশ্বের জন্য যতটা সহজ, বাংলাদেশের মতো জনবহুল রাষ্ট্রে ততটা সহজ নয়। তবুও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মানের সাথে টিকে থাকতে হলে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে  প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।  
সরকারের আরো পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহরাঞ্চলে জনগণের চাপ কমাতে সম্ভাব্য সব পরিকল্পনা নিয়েও সরকার কাজ করছে।  রাজধানী ঢাকাসহ শহরগুলোর সাথে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ করার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুবিধা বাড়িয়ে  শহরাঞ্চলে মানুষের চাপ কমানোর পরিকল্পনা  একটি কার্যকর বিকল্প বলেও সরকার মনে করে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। দেশের  বিদ্যমান নগরায়ণ পরিস্থিতিতে  রাজধানী এবং কিছু বড় শহরের যে কেন্দ্রীভূত উন্নয়ন এর বাইরে এসে বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ নয়, বরং বিকেন্দ্রীভূত, ভারসাম্যপূর্ণ নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন। প্রকৃতি ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয় শহর ও জেলা ও উপজেলা শহরে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা হচ্ছে। 
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের সভাপতিত্বে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, জাতিসঙ্ঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিস ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেচনিয়াক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: ওবায়দুর রহমান বক্তব্য রাখেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ গাছের চারা রোপণ করেন।
শিক্ষক দিবসের আলোচনা : এদিকে সোমবার বিকেলে বিশ্ব শিক্ষক দিবস- উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুণœ থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে। দেশের শিক্ষক সমাজ বিশেষ করে স্কুল মাদরাসার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান এবং শিক্ষকতা পেশাকে সুযোগ এবং সম্মানের দিক থেকে প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। 
শিক্ষকতা পেশা কখনোই ‘উপায়হীন বিকল্প’ কিংবা একটি সাধারণ চাকরির মতো হতে পারে না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বরং শিক্ষা দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবী মানুষটি যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতা পেশাকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন  শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে সেভাবেই ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র এবং সমাজে শিক্ষকদের সম্মান এবং মর্যাদার সাথে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণœ থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে। আমরা দেশে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা বঞ্চিত থাকবে না। শিক্ষা জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকে কেউ কোনো কারণে ড্রপ আউট হলেও যেন কাউকে বেকার থাকতে না হয় সেটি নিশ্চিত থাকা জরুরি।
রাজধানীর  ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এই আলোচনা সভা হয়। শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতেই বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে থাকে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের  বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের শতাধিক গুণী শিক্ষককে সম্মাননা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। সম্মাননার অংশ হিসেবে প্রত্যেক গুণী শিক্ষককে দুই লাখ টাকা, একটি ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দেয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০ জন, কলেজ পর্যায়ে ২৫ জন, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ২০ জন, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনজন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনজন এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চারজন শিক্ষককে সম্মাননা দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত সাতজন শিক্ষককেও সম্মাননা দেয়া হয়।
সারা বিশ্বের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যারা গুণী শিক্ষক হিসেবে পুরস্কৃত হলেন আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাই। এভাবেই সম্মানিত শিক্ষকগণ যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে একজন সুনাগরিক হিসেবে  বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা আমাদের জন্য আরো সহজ হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে। এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস হাতে পাচ্ছে। সুতরাং শিক্ষার্থীরা যাতে বই বিমুখ হয়ে না ওঠে এ ক্ষেত্রে ‘শিখন’ এবং ‘শিক্ষন’ পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  মুখস্থ করার চেয়ে ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ এই প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীদের মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলা জরুরি। কৌতূহল থাকলে শিক্ষার্থী নিজেও নিজের শিক্ষক হয়ে ওঠে। 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অস্বীকার করতে পারি না দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা সুযোগের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এখনো কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে শহরাঞ্চল কিংবা গ্রামাঞ্চল  সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাই যাতে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে সরকারের নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে। 
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হকের সভাপতিত্বে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া, জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ ও শিক্ষাসচিব আবদুল খালেক বক্তব্য রাখেন।
বরিশালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত
বরিশাল ব্যুরো জানায়, ‘শিক্ষকদের পাশে : পেশা সুরক্ষা, এর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’ প্রতিপাদ্যে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে বরিশাল জেলা স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণাঢ্য রথ্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি  নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সমাপ্ত হয়। পরবর্তীতে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সভাকক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসক মো: মামুন খন্দকার প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে বরিশাল জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের সভাপতিত্বে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উপমা ফারিসা, শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ ও গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন।