নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্ষাকাল পেরিয়ে গেলেও সংক্রমণের গতি কমার কোনো লক্ষণ নেই; বরং অক্টোবরের শুরুতেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৯০২ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে সরকারি হিসাবে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭১ জনে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ৮৮ হাজার ৩৬০ জনে।  স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গুবিষয়ক দৈনিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০৬ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২৩৩ জন রয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো ৪০১ জন। অর্থাৎ, রাজধানী ও আশপাশের এলাকাতেই এক দিনে ৮৩০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। 
রাজধানীর বাইরেও পরিস্থিতি দিন দিন আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগে ২১৬, চট্টগ্রামে ২৭২, খুলনায় ৩০৬, ময়মনসিংহে ৯৮, রাজশাহীতে ১০৫, রংপুরে ৬৬ এবং সিলেটে ৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তিনজন, বরিশালের দুইজন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের একজন করে রয়েছেন। 
সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতির বড় অবনতি : চলতি বছরে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানে। গত মাসে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ১৪৮ জন। চলতি বছরের একক মাস হিসেবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর-উভয় ক্ষেত্রেই এটি সর্বোচ্চ। জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হলেও জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে এক লাফে ১৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। 
অক্টোবরের শুরুতেও স্বস্তির দেখা মেলেনি। মাসের প্রথম কয়েক দিনেই হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর আগে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছরে ৮৪ হাজার ৩৬৯ জন হাসপাতালে ভর্তি ও ২৫৬ জনের মৃত্যুর তথ্য ছিল। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব যুক্ত হয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৮ হাজার ৩৬০ এবং মৃত্যু বেড়ে ২৭১ জনে দাঁড়িয়েছে। 
তরুণ ও কর্মক্ষমরাই বেশি আক্রান্ত : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি রোগীদের মধ্যে ২১-২৫ বছর বয়সী ২৫৩ জন, ২৬-৩০ বছর বয়সী ২৬৬ জন এবং ১৬-২০ বছর বয়সী ২৫০ জন রয়েছেন। ৩১-৪০ বছর বয়সীরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। মোট নতুন রোগীর মধ্যে এক হাজার ১৪১ জন পুরুষ এবং ৭৬১ জন নারী। 
স্বস্তির বিষয় হলো, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ৯৮৮ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট ৮২ হাজার ৩৩৫ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। 
এডিস নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ : বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একই সাথে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং নগর ও গ্রামাঞ্চলে সমন্বিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যেও ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের পরিস্থিতি এখনো ২০২৩ সালের রেকর্ড মহামারির পর্যায়ে না পৌঁছালেও বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, ওই বছর দেশে তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি এবং এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। 
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ড্যাশবোর্ডের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকার স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়; এটি কার্যত সারা দেশের একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, জ্বর, শরীরব্যথা আর দুর্বলতা নিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসছেন একের পর এক মানুষ। কারো হাতে ডেঙ্গু পরীক্ষার রিপোর্ট, কারো চোখে স্বজনকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরানোর উৎকণ্ঠা। হাসপাতালে জায়গা মিললেও স্বস্তি মিলছে না অনেকের। রোগীর পাশে বসে রাত কাটাচ্ছেন স্বজনরা। কোথাও স্যালাইন হাতে মেঝেতে, কোথাও ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে রোগীদের। এর সাথে যোগ হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত ও পথ্যের বাড়তি খরচ। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একটি পরিবারের জন্য তাই রোগীর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক ও মানসিক চাপও।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও তার আভাস মিলছে। চলতি অক্টোবরের প্রথম চার দিনেই চট্টগ্রামে ৩৪১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৮০৭ জনে। এ সময়ে মারা গেছেন ২১ জন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ২৪১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ পর্যন্ত চার হাজার ৫৬৬ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালু রয়েছে। ১৩ ও ১৪ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। ওয়ার্ডের পাশাপাশি হাসপাতালের বারান্দাতেও অনেক রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।
রাঙ্গুনিয়া থেকে বোনকে নিয়ে চমেকে এসেছেন কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে বোনকে নিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে অবস্থান করছি। ওয়ার্ডে সিট মিলছে না।’
ডেঙ্গুর চাপ বেড়েছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালেও। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেন জানান, আগের তুলনায় ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে। একপর্যায়ে সেখানে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। 
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালেও রোগীর চাপ সামলাতে আলাদা ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা সেল চালু করা হয়েছে। সেখানে পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য ১৫টি শয্যা রাখা হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ডা. নূর মোহাম্মদ নয়া দিগন্তকে বলেন, অনেক রোগী শক সিনড্রোম ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। কারো কারো রক্তচাপ মাপাও সম্ভব হচ্ছে না। আবার কেউ শক ও রক্তক্ষরণ-দুই ধরনের জটিলতা নিয়েই আসছেন। তিনি বলেন, রোগীর সংখ্যা বাড়লে অতিরিক্ত শয্যার পাশাপাশি নার্সিং সাপোর্ট ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়। গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইসিইউ। সেপ্টেম্বরেও চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একাধিক ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অর্পিতা দাশ ও তার অনাগত সন্তানও ছিলেন। সীতাকুণ্ডের পাঁচ বছরের শিশু মনিরারও শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।