নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সঙ্ঘাত নিরসনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করতে চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদ সফরে যাচ্ছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। আজ মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার। খবর আলজাজিরার। 
জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, সফরে পাকিস্তানের ‘কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা’ নিয়ে আলোচনা করবেন গুতেরেস। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরি এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ এগিয়ে নিতে ইসলামাবাদের ভূমিকা গুরুত্ব পাবে। সফরকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহাম্মদ ইসহাক দারের সাথে বৈঠক করবেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।
গুতেরেসের সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সঙ্ঘাত থামাতে পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্রের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গুতেরেসের সফর ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচনায় পাকিস্তানের ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করবে। এর আগে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন।  জাতিসঙ্ঘের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গুতেরেসের মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তানের নেতৃত্বের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার প্রতি মহাসচিব কৃতজ্ঞ এবং তিনি মনে করেন, সঙ্ঘাত বন্ধে ইসলামাবাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার মধ্য দিয়ে যে সমঝোতার উদ্যোগ তৈরি হয়েছিল, তা সঙ্ঘাত কমানো এবং খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
যুদ্ধ থামাতে সংলাপের আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত নিয়ে জাতিসঙ্ঘ শুরু থেকেই সামরিক সমাধানের পরিবর্তে কূটনীতি ও আলোচনার ওপর জোর দিয়ে আসছে। জাতিসঙ্ঘের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে গুতেরেস বারবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার অবস্থান হলো, সঙ্ঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি ঘোষণার পর গুতেরেস সেটিকে সঙ্ঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। সেই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের পাশাপাশি কাতার, মিসর, সৌদি আরব ও তুরস্কের ভূমিকারও প্রশংসা করেছিল জাতিসঙ্ঘ। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির আবার অবনতি হওয়ায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
ইসলামাবাদে কী নিয়ে আলোচনা হতে পারে?
গুতেরেসের পাকিস্তান সফরে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার বর্তমান অবস্থা, পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পরবর্তী ধাপ এবং সঙ্ঘাতের বিস্তার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ। পাকিস্তান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। ইসলামাবাদ মনে করে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; জ্বালানি, খাদ্য, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। জাতিসঙ্ঘও সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম, বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলে বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
গুতেরেস এর আগে সর্বশেষ পাকিস্তান সফর করেছিলেন ২০২২ সালে। সে সময় ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত দেশটির পরিস্থিতি দেখতে তিনি পাকিস্তান সফর করেন। চার বছর পর তার নতুন সফরটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সঙ্ঘাত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগই সফরের আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। পাকিস্তানের সাথে জাতিসঙ্ঘের সাম্প্রতিক যোগাযোগও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত নিয়ে ইসলামাবাদের উদ্যোগের বিষয়ে গুতেরেসের কার্যালয় নিয়মিতভাবে অবহিত হচ্ছে এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। গুতেরেসের ইসলামাবাদ সফর তাই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সঙ্ঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরো এগিয়ে নেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইআরজিসির বাধায় হরমুজ থেকে ফিরে গেল তেলবাহী ট্যাঙ্কার
আলজাজিরা জানায়, হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে পথ আটকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। নির্দেশ না মানলে জাহাজে হামলা চালানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয় আইআরজিসি। এতে বাধ্য হয়ে ট্যাঙ্কারটির ক্যাপ্টেন পথ পরিবর্তন করে ফিরে যান। ব্রিটেনের সামুদ্রিক বাণিজ্যসংক্রান্ত সংস্থা ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স’ (ইউকেএমটিও) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওমানের খাসাব উপকূল থেকে ১১ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২০ কিলোমিটার) উত্তরে আন্তর্জাতিক পানিসীমায় এই ঘটনা ঘটে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যখন চরম ঝুঁকির মুখে, ঠিক তখনই এই ঘটনা ঘটল।  গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকেই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত এই  নৌপথটি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান।
ইরান থেকে ১ হাজার কিলোমিটার দূরে মার্কিন বাহিনী
ইরানের সীমান্ত থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে সরে গেছে বলে দাবি করেছেন দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড  কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ফাদাভি। ইরানের প্রেস টিভিকে দেয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন। আলী ফাদাভি বলেন, ‘আমেরিকানরা পালিয়ে গেছে এবং আমাদের সীমান্ত থেকে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে সরে গেছে। এটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ছিল না। ইসলামিক রিপাবলিক ও আইআরজিসির স্থলবাহিনীর শক্তির কারণেই তারা এমনটা করতে বাধ্য হয়েছে।’ ফাদাভি আরো বলেন, প্রথমবারের মতো পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী, ওমান সাগর এমনকি উত্তর ভারত মহাসাগরেও কোনো মার্কিন নৌযান নেই। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো আইআরজিসির হামলার ক্ষেত্রে ‘১০০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে ফাদাভি এমন দাবি করলেও ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড গত সপ্তাহে জানিয়েছে, জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত কঠোরভাবে অবরোধ কার্যকর নিশ্চিত করতে তারা ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
সব মার্কিন ঘাঁটি-যুদ্ধজাহাজে হামলার হুঁশিয়ারি 
তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল আক্রমণ শুরু করে তবে সব আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি এবং যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ফাদাভি । তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা যদি স্থল হামলা চালায়, তবে আমরা আমেরিকানদের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি স্থান, আমেরিকান ঘাঁটি এবং আমেরিকানদের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি জাহাজে আঘাত হানব।’ তিনি দাবি করেন, সামরিক শক্তির ভাষা যুক্তরাষ্ট্র বোঝে এবং ইরানের সামরিক সরঞ্জাম তৈরির হার ব্যবহারের হারের চেয়েও বেশি। কৌশলগত হরমুজ প্রণালী সম্পর্কে ফাদাভি জানান, প্রণালীটি পরিচালনার জন্য ইরান ও ওমানের যৌথভাবে নিয়ম তৈরি ও তা প্রয়োগ করা উচিত, যার প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন জাহাজগুলোকে অঞ্চলে পুনরায় মোতায়েন করা হলে সেগুলো ইরানের হামলার মুখে চরম ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তেহরান কোনো মুসলিম দেশে আক্রমণ করেনি, বরং সেসব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির জবাবে ইরানের সীমানায় যেকোনো হামলার তীব্র সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলে তিনি পুনরায় হুঁশিয়ারি দেন।