খালিদ সাইফুল্লাহ
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-তেল-সারের সঙ্কট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার দাবিতে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া রুটে লংমার্চের ডাক দিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জাতীয় রাজনীতির বর্তমান জটিল সমীকরণে এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমার কর্মসূচি কতখানি রাজনৈতিক গুরুত্ব বহনে সক্ষম হবে এবং এটি সরকারের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। তবে তৃতীয় এ লংমার্চ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনমনে প্রধান যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো- ৩১ অক্টোবরের এ কর্মসূচি কি কেবল দলীয় নেতাকর্মীদের মহড়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ঘটবে? রাজনীতির মাঠে এ প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে রাজপথের আন্দোলনের আসল প্রভাব।
কর্মসূচির রূপরেখা ও রুট সমীকরণ
১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৩১ অক্টোবর সকালে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু হয়ে এ লংমার্চ খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রধান পথগুলো অতিক্রম করবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এ মহাসড়কটি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। ঐক্যের শীর্ষ নেতারা দাবি করছেন, জনস্বার্থ সংশ্লষ্ট ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে তাদের এ রাজনৈতিক উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অনিয়মিত সরবরাহ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান উপাদান সারের উচ্চমূল্য ও সঙ্কট সাধারণ কৃষিজীবী ও শিল্প মালিকদের দিশেহারা করে তুলেছে। এর ওপর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। জোট নেতাদের মতে, তারা শুধু ক্ষমতার রাজনীতির জন্য নয়, বরং জুলাই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের দৈনন্দিন ভোগান্তি তুলে ধরতেই জাতীয় মহাসড়কে নামছেন।
জনসম্পৃক্ততা বনাম দলীয় সমাবেশ : আসল চ্যালেঞ্জ কোথায়?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় আন্দোলন বা লংমার্চের সফলতা দু’টি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে- এক, সুসংগঠিত দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি; এবং দুই, সাধারণ আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক যোগদান। ১১ দলীয় জোটের এ কর্মসূচির ক্ষেত্রে বড় পরীক্ষাটি এখানেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ লংমার্চের সামনে কয়েকটি বড় সমীকরণ রয়েছে-
ইস্যুর প্রাসঙ্গিকতা ও জনগণের সংযোগ
লংমার্চের জন্য নির্ধারিত দাবিগুলোর মধ্যে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সঙ্কট সরাসরি প্রতিটি মানুষের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু এসব জনদুর্ভোগের বিষয়গুলোকে কতটুকু কার্যকর উপায়ে সাধারণ মানুষের ভাষায় উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে, তা একটি বড় প্রশ্ন। অনেক সময় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ক্ষোভ রাজনীতিতে স্থান পেলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব কার্যালয়কেন্দ্রিক বক্তব্যের কারণে মাঠপর্যায়ে সাধারণ নাগরিক নিজেকে কর্মসূচির অংশ বলে মনে করে না। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-রংপুরের দু’টি লংমার্চেই জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করেছে বিরোধী দলের এ কর্মসূচি জনসম্পৃক্ত হয়ে উঠেছে।
১১ দলের তৃণমূল সাংগঠনিক শক্তি
১১টি দল একত্র হলেও জোটের মধ্যকার সব দলের রাজনৈতিক ওজন ও তৃণমূলভিত্তি সমান নয়। লংমার্চ যেসব জেলা অতিক্রম করবে- যেমন ঢাকা, খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়া- সেখানে এ ১১টি দলের স্থানীয় সংগঠন কতটা শক্তিশালী এবং তারা সাধারণ জনগণকে কতটুকু সংগঠিত বা রাজপথে টানতে সক্ষম, তার ওপরই লংমার্চের বিশালতা নির্ভর করছে। যদি রাজপথে শুধু নির্দিষ্ট দলের ব্যানার, ফেস্টুন ও কর্মীদের সমাগম ঘটে, তবে এটি একটি গতানুগতিক দলীয় মহড়ায় রূপান্তরিত হবে। গত জাতীয় নির্বাচনে খুলনা বিভাগের মোট ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টি আসনই পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ফলে কর্মসূচিতে ব্যাপক জনসম্পৃক্তার আশা করছে জামায়াতসহ ১১ দল।
অর্থনৈতিক সঙ্কট বনাম সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক উদাসীনতা
নিত্যপণ্যের দামের জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ বর্তমানে নিজেদের জীবন-জীবিকা সামলাতেই ব্যস্ত। গণভোটে নিজেদের মতামত কার্যকর করা বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সশরীরে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই এক ধরনের উদাসীনতা বা ক্লান্তি লক্ষ করা যায়। সাধারণ মানুষ যদি মনে করে এই আন্দোলন তাদের পকেটের টান কমানোর কার্যকর কোনো বার্তা দিতে পারছে না, তবে তারা এই ধরনের কর্মসূচিতে দর্শক হিসেবেই থেকে যাবে।
রাজনৈতিক চাপের মাত্রানির্ধারণ
এ লংমার্চ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঠিক কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা নির্ভর করছে আন্দোলনের তিনটি প্রধান উপাদানের ওপর : পথসভার উপস্থিতি : মহাসড়কের মোড়ে মোড়ে এবং বিভিন্ন পয়েন্টে অনুষ্ঠিত পথসভাগুলোতে স্থানীয় পথচারী ও অধিবাসীদের প্রতিক্রিয়া কী হবে। কর্মসূচির ধারাবাহিকতা: ৩১ অক্টোবরের একদিনের লংমার্চ কি নিছক একটি এক দিনের ঘটনা হবে নাকি এরপর দলগুলো ধারাবাহিক ও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে।
সরকার ও প্রশাসনের কৌশল : প্রশাসন যদি এ কর্মসূচিতে বাধা বা কড়াকড়ি আরোপ করে, তবে জনমনে তা নিয়ে সহানুভূতি সৃষ্টি হতে পারে। অন্য দিকে, স্বাভাবিকভাবে লংমার্চ সম্পন্ন হতে দিলে এর গতি বা প্রভাব কতটুকু টিকে থাকে, তা রাজনৈতিক দরকষাকষিতে প্রভাব ফেলবে। ১১ দলের নীতিনির্ধারকদের দাবি, এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির মহড়া নয়। জনগণের ক্ষোভ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই ক্ষোভের মুখপাত্র হতে হয়। তারা আশাবাদী যে, খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া রুটের সাধারণ মেহনতি মানুষ ও কৃষক সমাজ লংমার্চে সংহতি প্রকাশ করবে।
ময়দানের বাস্তবতা কী হতে পারে?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ১১ দল যদি এ পথযাত্রাকে প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত করে, তবে এতে সাধারণ মানুষের যোগদানের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু যদি লংমার্চ চলাকালে স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক এবং বাজার দর ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ভুগতে থাকা স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করার সুনির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণ করা হয়, তবে আন্দোলন ভিন্নমাত্রা পেতে পারে।
৩১ অক্টোবরের সূর্য ওঠার পর রাজপথের গণজমায়েতের যে চিত্র ফুটে উঠবে, সেটিই প্রমাণ করবে এটি নিছকই ১১টি দলের কর্মীদের একটি শোডাউন নাকি এতে বাস্তবে প্রতিফলিত হতে যাচ্ছে দেশের নিত্যদিনের অর্থনৈতিক সঙ্কটে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণের ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর। রাজনীতিতে যেকোনো দাবির পেছনে ‘জনগণের শক্তি’ কতখানি দৃশ্যমান, তা দিয়েই সব সময় আন্দোলনের ভাগ্য এবং সরকারের রাজনৈতিক চাপের পরিমাপ নির্ধারিত হয়।





