নিজস্ব প্রতিবেদক

গত বছরের ৫ অক্টোবর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি প্যাকেট ময়দা বিক্রি হয়েছে ৬৫ টাকা কেজি দরে। সেই একই ময়দা গতকাল খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকা কেজিতে। এক বছরের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের এই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ। একইভাবে গত বছরের এই দিনে প্রতি কেজি আটা বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকা কেজি দরে। সেই একই আটা গতকাল বিক্রি হয়েছে ৬৫ টাকা কেজি দরে। এক বছরের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের এই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য জানা গেছে। 
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই জ্বালানি তেলের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। যেসব পণ্যের দাম এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও সামনে দাম বাড়ার আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
গত এক বছরের ব্যবধানে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ। প্রতি কেজি সয়াবিন তেল গত বছরের এই দিনে বিক্রি হয়েছে ১৮৮ টাকা লিটার দরে। সেই একই তেল গতকাল খুচরা বাজারের বিক্রি হয়েছে ২০৪ টাকা লিটার। একইভাবে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামই বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে। দুই দিনের মধ্যেই সারা দেশে বাস ও লঞ্চ ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ট্রাক ও পিকআপে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও অঘোষিতভাবে বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী রোকন মিয়া বলেন, আগে থেকেই পণ্যের দাম বাড়তি ছিল। এখন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দাম আরো কিছুটা বেড়েছে। একটি পিকআপের ভাড়া আগের তুলনায় ৪০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। ফলে দামও কিছুটা বাড়াতে হচ্ছে। 
রাজধানীর বাসাবোতে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সুমন তালুকদার বলেন, প্রত্যেকদিন বাজারে এসে শুনি কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছে। এক দিন তেলের দাম বাড়ে, আরেক দিন সবজি-মাছ গোশতের দাম বাড়ে। আয় তো সেইভাবে বাড়ে না; কিন্তু বাজারে এলেই খরচ বাড়তেছে। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ২০০ টাকায়। গত সপ্তাহে এই সবজির দাম ছিল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে শিমের দাম সর্বোচ্চ ৩০ টাকা বেড়েছে।
টমেটোর দাম ৮০-১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০-১২০ টাকা হয়েছে। দেশী শসা ৫০-৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা এবং করলা ৬০ থেকে বেড়ে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের দামও ৮০-১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০-১২০ টাকায় উঠেছে। এ ছাড়া প্রতিটি লাউ ৭০-৮০ টাকা, কচুরলতি ৮০ টাকা এবং গাজর ১২০-১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটোলের দাম কেজিতে ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। ধুন্দল ১০ টাকা বেড়ে ৭০-৮০ টাকা, বরবটি ৭০-৮০ টাকা এবং ঝিঙা ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচামরিচের দামও বেড়েছে। কিছুদিন আগেও প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা থাকলেও বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে তা ১৮০-২০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্য দিকে পেঁয়াজ ৪৫ টাকা, দেশী রসুন ১২০ টাকা, ভারতীয় রসুন ১৮০ টাকা এবং আদা ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। সবজির পাশাপাশি মুরগির বাজারেও বাড়তি দামের চাপ দেখা গেছে। বাজারে সোনালি মুরগি ৩৩০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মুরগির উৎপাদন কমেছে, অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কাপ্তান বাজার থেকে পিকআপে করে মুরগি আনার কারণে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে তাদেরও বেশি দামে মুরগি কিনতে হচ্ছে।
মুরগির পাশাপাশি মাছের বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। বাজারে আকারভেদে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা কেজি দরে। দুই কেজি ওজনের রুই মাছ ৩৮০-৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ টাকা, মাঝারি কাতল ৪০০ টাকা এবং বড় কাতল ৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বড় তেলাপিয়া ২৮০ টাকা, ছোট তেলাপিয়া ২৪০ টাকা এবং পাঙ্গাশ ২০০-২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের চিংড়ির দাম আকারভেদে ৭০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। 
ডিমের দামও রাজধানীর বাজারভেদে ভিন্ন। অধিকাংশ বাজারে গত সপ্তাহে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ১৫০-১৬০ টাকা। পরিবহন ভাড়া বাড়ার পর অনেক বাজারে ডজনপ্রতি প্রায় ১০ টাকা করে দাম বেড়েছে।
প্যাকেটজাত তরল দুধের দামও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। গত দেড় মাসে দুই দফায় লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। মিল্কভিটার পর আড়ং, প্রাণ ও ফার্মফ্রেশসহ বেসরকারি কোম্পানির দুধ এখন লিটারপ্রতি ১২০ টাকা এবং আধা লিটার ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবহন, দুধ সংগ্রহ, প্যাকেজিং, গোখাদ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়কে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।