নিজস্ব প্রতিবেদক

গাজীপুরের পাতারটেক ও রাজধানীর কল্যাণপুরে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে ১৬ জনকে হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ ১৮ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর এসব মামলার শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
গতকাল মঙ্গলবার প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল এ দিন ধার্য করেন। চিফ প্রসিকিউটর ছুটিতে থাকায় রাষ্ট্রপক্ষ নতুন করে সময় আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এর আগে দুই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উপস্থাপনের শুনানি শেষ হয়েছিল। মামলাগুলো ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তরের পর নতুন করে শুনানির তারিখ দেয়া হয়।
২০১৬ সালে গাজীপুরের পাতারটেক ও রাজধানীর কল্যাণপুরে কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নামে যথাক্রমে সাত ও ৯ তরুণকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন। এসব হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে দেখিয়ে শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।
পাতারটেকে সাত হত্যা
গাজীপুরের পাতারটেকে সাতজনকে ‘জঙ্গি’ সাজিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক এসবি প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং সাবেক সিটিটিসির সহকারী পুলিশ কমিশনার (টিম লিডার, সোয়াট) এস এম জাহাঙ্গীর হাছান।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন এ কে এম শহীদুল হক ও আসাদুজ্জামান মিয়া।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে সাতজনকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের তুলে নিয়ে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছিল। পরে সিটিটিসির নেতৃত্বে ‘অপারেশন শরতের তুফান’ নামে অভিযান চালিয়ে সোয়াট সদস্যরা তাদের গুলি করে হত্যা করেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, অভিযানটি ছিল পরিকল্পিত এবং নিহতদের জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করতে ঘটনাটি সাজানো হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পর সাতজনের লাশ নিতে এলে তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে বলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল হুমকি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন প্রসিকিউটর।
নিহত সাতজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। অন্য তিনজন হলেন মো: ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইবরাহীমের বাবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন।
চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-১।
কল্যাণপুরে ৯ তরুণ হত্যা
রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে ৯ তরুণকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় শেখ হাসিনাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানিও আগামী ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়েছে।
এ মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায়, তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন এবং আরো দুই পুলিশ কর্মকর্তা।
এ মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক ও ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো: আসাদুজ্জামান মিয়া। মঙ্গলবার তারা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত একটি ভবনে কথিত জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ নামে ওই অভিযানে ৯ তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম এর আগে ট্রাইব্যুনালে শুনানিতে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণদের ধরে এনে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে নিয়ে হত্যা করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অনেকেই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে তাদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১। পরে পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ করা হয়।
ধনঞ্জয়কে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক যুগ্ম সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাসকে আত্মসমর্পণ করতে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২।
মঙ্গলবার শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ধনঞ্জয় কুমারের ঠিকানায় গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে গ্রেফতার করতে না পারার প্রতিবেদনও ট্রাইব্যুনালে দেয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে আত্মসমর্পণের জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন আদালত। এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ২৫ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে। এ মামলার আরেক আসামি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সচিব মো: জাহাংগীর আলম গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। মঙ্গলবার তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
গত ২৭ আগস্ট মামলার শুনানিতে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জহিরুল আমিন অভিযোগ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সরকার পরিকল্পনা করে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। সে সময় সরকারের যেসব সভায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হতো, সেখানে ধনঞ্জয় কুমার দাস ও জাহাংগীর আলম উপস্থিত থাকতেন বলে দাবি করেন তিনি।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বাসায় অনুষ্ঠিত ‘কোর কমিটি’র সভায় তারা উপস্থিত থাকতেন এবং গণভবনে যাতায়াত করে সেখান থেকে নির্দেশনা নিয়ে আসতেন। পরে মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের তদারকিও করতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হত্যাকাণ্ড চালালেও তা প্রতিরোধে তারা ব্যবস্থা নেননি বলেও অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
তিন মামলারই পরবর্তী কার্যক্রম এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ অনুষ্ঠিত হবে।
এ দিকে গতকাল ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনটি মামলা ছিল। এর মধ্যে একটি মামলায় সাবেক শিল্পপ্রতিমন্ত্রী কামাল মজুমদার চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে যেতে ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করেছিলেন। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ মেডিক্যালে চিকিৎসা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ছাড়া জিয়াউল আহসানের মামলায় এদিন তদন্তকর্মকর্তা সাক্ষী দিয়েছেন। মামলার ১৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের প্যানেল। অপর সদস্য হলেন- বিচারক মুহিতুল হক চৌধুরী।