নিজস্ব প্রতিবেদক
সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পকে টেকসইভাবে শক্তিশালী করা এবং দেশের রফতানি সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি আরো সুদৃঢ় করা সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের স্বার্থে বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের সাথে আলোচনা করা হবে।
গতকাল রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতাদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠকে টেক্সটাইল খাতের প্রণোদনা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, কর ও শুল্ক এবং বিভিন্ন নীতিগত জটিলতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার জামায়াত আমিরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বিরোধী দল হিসেবে সরকারের সব কাজের বিরোধিতা করা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয় বলে জানিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি আরো বলেছেন, আমরা একটি গঠনমূলক বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে চাই। সরকারের যেসব উদ্যোগ জনস্বার্থে ও দেশের কল্যাণে হবে, সেসব কাজে আমরা সহযোগিতা করব। আর যেসব সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী হবে, সেসব বিষয়ে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরব, সমালোচনা করব এবং প্রয়োজন হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলব।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিটিএমএর নেতারা তাদের খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা হয়েছে। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান টেক্সটাইল খাতের গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিশ্চিতকরণ, দেশীয় প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা সংরক্ষণ, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও সংরক্ষণ, সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও অবৈধ আমদানি প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, শিল্প ও উৎপাদন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তৈরী পোশাকশিল্পের সাথে টেক্সটাইল খাতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এ খাতের যৌক্তিক সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার, বিরোধী দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বিটিএমএ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, বর্তমানে এ খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে এবং বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে টেক্সটাইল খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সাথে এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সাথে তারা একাধিকবার বৈঠক করেছেন এবং কিছু সমস্যা ইতঃমধ্যে সমাধান হয়েছে। অন্য সমস্যাগুলো নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
শফিকুল ইসলাম সরকার আরো বলেন, বৈঠকে বিশেষ করে প্রণোদনা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, কর বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন নীতিগত জটিলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হলেও কয়েকটি কারখানা এখনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া এনার্জি বন্ড ও সুতার অপব্যবহারসহ সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়েও সরকারের সাথে তাদের আলোচনা চলছে বলে তারা জানিয়েছেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আমরা বিটিএমএর নেতাদের বক্তব্য গুরুত্বের সাথে শুনেছি এবং আশ্বস্ত করেছি যে, জনগণের স্বার্থ ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এসব বিষয় জাতীয় সংসদে তুলে ধরা হবে এবং সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা হবে।
বৈঠক শেষে বিটিএমএ-এর নেতারা ডা. শফিকুর রহমান ও জামায়াতের নেতাদের ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, বৈঠকে টেক্সটাইল খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, বিনিয়োগ ও সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান হবে এবং দেশের টেক্সটাইল ও তৈরী পোশাকশিল্প আরো শক্তিশালী হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
আগামী ১৮ নভেম্বর বস্ত্র ও পোশাকসংশ্লিষ্ট বাটেক্সপো মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার প্রধান অতিথি হওয়ার দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রম হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে।
তিনি বলেন, এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সাথে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক মর্যাদার বিষয়ও জড়িত। এবার এ রীতির ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান নিজে কোনো অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য দাবি বা অনুরোধ করেননি বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি আরো বলেন, দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কোনো খাতকে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ করা উচিত নয়। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সাথে রাষ্ট্রের সব পক্ষের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
টেক্সটাইল খাতের কোনো কোনো সমস্যা এরই মধ্যে সমাধান হয়েছে- এ প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে এবং কিছু সমস্যা সমাধানও হয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহসহ কয়েকটি বিষয়ে এখনো কিছু কারখানা সমস্যায় রয়েছে। তিনি বলেন, বিশেষ করে যেসব বিষয় এখনো সমাধান হয়নি, সেগুলো নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্বের জায়গা থেকে শিল্পখাত ও অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না- এ প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়। তিনি বলেন, জনস্বার্থে সরকারের ভালো উদ্যোগে সহযোগিতা করা এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা বিরোধী দলের দায়িত্ব। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরা এবং সরকারের সাথে আলোচনা করাও সেই দায়িত্বের অংশ।
বৈঠকে বিটিএমএ-এর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিটিএমএ-এর প্রেসিডেন্ট এবং আম্বার কটন মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেল, বিটিএমএ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পূর্বানী ইয়ান ডাইং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম সরকার, বিটিএমএ-এর পরিচালক এবং জালাল আহমেদ স্পিনিং মিলস লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: শাহিদ আলম, বিটিএমএ-এর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং হোসেন ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস লিমিটেডের (ইউনিট-২) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসেন মেহমুদ, বিটিএমএ-এর পরিচালক এবং সায়হাম কটন মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, বিটিএমএ-এর সাবেক পরিচালক এবং মোশারফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মোশারফ হোসেন, বিটিএমএ-এর সেক্রেটারি জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন, এনডিসি, পিএসসি (অব.), বিটিএমএ-এর জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ জিয়াউর রহমান, বিটিএমএ-এর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল জিয়াউল হাসান চৌধুরী, বিটিএমএ-এর প্রেসিডেন্টের পিএস আরিফ রায়হান রবিন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো: সেলিম উদ্দিন, মাইশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া প্রমুখ।





