নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে শিশুদের প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান। এ সময় তিনি বলেন, শুধু পড়ালেখা শিখলে, খেলাধুলায় ভালো হলে, আর্ট কালচারে ভালো হলেই হবে না। শুধু কয়েকটি ভাষা জানলেই হবে না। তোমাদের কিন্তু মানবিকও হতে হবে। এই দেশের প্রকৃতি, এই দেশের পশুপাখির প্রতিও তোমাদেরকে মানবিক হতে হবে।
শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এবারের আয়োজনে প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর শিশু একাডেমির শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অতিথি সারিতে বসে উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। শিশুদের স্মারক উপহার প্রদান, স্মরণিকা ‘শৈশব’-এর মোড়ক উন্মোচন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের সাথে কথা বলার কর্মসূচিতেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া শিশুদের আঁকা ছবি ও ফটো গ্যালারি পরিদর্শনও করেন তিনি। পরে তিনি শিশু জাদুঘর ভবনে যান এবং ভবনটির নিচতলায় স্থাপিত সোলার প্যানেল ও সাব স্টেশনের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর একটি পর্ব ছিল শিশুদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব। এতে অংশ নিতে মঞ্চে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী।
প্রধানমন্ত্রী শিশুদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ থাকবে যে তোমরা যখন বড় হচ্ছো, তোমার আশপাশে যে প্রকৃতি আছে, অর্থাৎ তোমার আশপাশে যে গাছপালা আছে, বাড়ির আশপাশে হোক কিংবা স্কুলের মধ্যে হোক, তুমি যেই জায়গাটি পছন্দ করো তার আশপাশেই হোক যদি কোনো গাছ থাকে সেটিও তোমার মতো ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তোমার মতো গাছটি যাতে বড় হতে পারে সে জন্য তুমি গাছটিকে সাহায্য করো, গাছটিকে পানি দাও, তুমি গাছটিকে যতœ করো যাতে সেটি বড় হতে পারে।
অভিভাবকদের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনার সন্তান আপনার শিশুকে এই অনুভূতিটুকু, এই বোধটুকু দিন যে যাতে করে সে প্রকৃতির প্রতি কাইন্ড হয়, যাতে করে সে প্রকৃতি সৃষ্টি পশুপাখির প্রতি কাইন্ড হয়। আমরা যদি সবাই মিলে চেষ্টা করি তা হলে এক দিন একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।
শিশুদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমার সামনে কোনো বড় মানুষ যদি কোনো একটি ময়লা বা আবর্জনা বা অব্যবহৃত কোনো জিনিস যত্রতত্র ফেলে দিয়ে পরিবেশকে ক্ষতি করে, পরিবেশকে ময়লা করে তুমি ছোট হিসেবে কিন্তু তুমি তাকে লজ্জা দিয়ে বলতে পারো যে, ময়লাটি সঠিক জায়গায় ফেলুন। তিনি বলেন, যারা মুরুব্বি আছেন, গার্ডিয়ান আছেন আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, আসুন আমরা শিশুদেরকে চেষ্টা করি তাদের মধ্যে এই বোধটুকু দিতে যাতে তারা নিজেরা সচেতন হয় এবং সেই সচেতনার মাধ্যমে যাতে আমরা একটি পরিষ্কার সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমি তোমাদের বলব না, পড়ো, পড়ো, পড়ো। আজকে আমি বলব, তোমাদেরকে খেলাধুলা করতে হবে। তোমাদের মধ্যে অনেকের অনেক রকম প্রতিভা আছে। কেউ তোমরা ভালো আঁকতে পারো, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারো, তোমাদের মধ্যে অনেকে আছো গিটার বাজাতে পারো। আমি চাই তোমরা যারা গিটার বাজাতে অথবা হারমোনিয়াম বাজাতে অথবা বাঁশি বাজাতে পছন্দ করো, এরকম যার যেটা আছে আমি চাই তোমরা সেটি শেষ করো। তোমরা যারা কুরআন তিলাওয়াত করতে পছন্দ করো, তোমরা সেইটা সুন্দরভাবে রপ্ত করো, যাতে সুন্দরভাবে তোমরা তিলাওয়াত করতে পারো; অর্থাৎ আমি চাই যে তোমরা তোমাদের যে ভেতরে যে কোয়ালিটিগুলো আছে, যেসব গুণ আছে সেগুলো সুন্দরভাবে তোমরা ফুটিয়ে তুলতে পারো।
অনুষ্ঠানে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, প্রতিটি শিশুর মধ্যে ঘুমিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা। সেই প্রতিভাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে নতুন উদ্যমে, নতুন উদ্যোগে। ইনশা আল্লাহ তোমরা সফল হবেই। প্রতিটি শৈশব হোক নিরাপদ, প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত এই আমাদের কামনা।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সচিব রওশন আরা বেগম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
প্রশ্নোত্তর পর্ব : শিশুদের প্রশ্নের জবাবে শিশুকালে মা-বাবার সাথে সুন্দরবনের হরিণ পয়েন্টে পুকুর পাড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পায়ের থাবা দেখার স্মৃতিচারণ করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আরেক শিশুর প্রশ্নের জবাবে বলেন, সত্যি কথা বলব, আসলে তখন কোনো স্বপ্ন দেখতাম না। তোমার মতো যখন ছোট ছিলাম তখন শুধু ভাবতাম বড় হয়ে সব খেলনা কিনে নেবো, এরকমই ভাবতাম আমি।
পড়াশোনা ও বিনোদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কিভাবে করা উচিত- এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আনফরচুনেটলি আমরা প্রায়ই দেখি ইদানীং যে সেটি ছোট হোক, বড় হোক অনেকেই আমরা অনেক সময় নিয়ে নিজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক সময় স্পেন্ড করি। আমি মনে করি এটি বোধহয় ঠিক না। যেই কাজটি তোমাকে হেল্প করবে, পড়ালেখা হোক বা অন্য যে বিষয় হেল্প করবে, সেগুলোতে মোর টাইম স্পেন্ড করা উচিত।
শিশুদের প্রশ্নের ধরন দেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে মনে হয় প্রশ্নগুলো বড়রা শিখিয়ে দিয়েছে। তোমাদের নিজেদের কিছু থাকলে জিজ্ঞেস করো। যেটা মনের মধ্যে আছে সেটা জিজ্ঞেস করো। এ সময় একজন শিশু জানতে চায়, প্রধানমন্ত্রী কোন স্কুলে পড়ালেখা করেছেন? জবাবে বলেন, আমি দুইটা স্কুলে পড়ালেখা করেছি। একটা শাহীন স্কুলে, ল্যাবরেটরি স্কুলেও ছিলাম।
আমাদের উদ্দেশ্যে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি কি? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা ভবিষ্যতে একজন কনফিডেন্ট মানুষ হিসেবে গড়ে উঠো, যেই মানুষটা বাংলাদেশকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হেল্প করতে পারবে। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ বা ইন্ডোর স্টেডিয়াম তৈরির কোনো পরিকল্পনা আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ আমাদের পরিকল্পনা আছে। স্টেডিয়াম ধর একটু কস্টলি ব্যাপার। আমরা ওপেন মাঠ প্রতিটি ইউনিয়নে বা উপজেলায় দেয়ার চেষ্টা করছি। অন্যান্য দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ে শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে আছে কি না- এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই আছে। আমরা চাই, স্পোর্টস বলো, সাইন্স ফেয়ার বলো, কুইজ কম্পিটিশন বলো, ম্যাথস কম্পিটিশন বলো, তোমাদের মতন বাচ্চারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে যাবে তাদেরকে সব রকম সহযোগিতা করে, যাতে তারা একটা সুন্দর ভালো রেজাল্ট নিয়ে আসতে পারে।
দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে কাজ করার অনুভূতি কেমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঞ্জারাস ব্যাপার, এখান থেকে কাজ করা খুব কঠিন। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য পরিকল্পনা কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের এই ফ্যাসিলিটিটা আছে বাট ভেরি লিমিটেড। আমরা এটিকে বড় করতে চাচ্ছি, এক্সপান্ড করতে চাচ্ছি।
দেশের জন্য কল্যাণকর ও বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আপনি কি বড়দের পাশাপাশি ছোটদের মতামতও জানতে চান? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভেরি ডিফিকাল্ট প্রশ্ন। আমার আশপাশে ছোট তেমন নেই। আমার একটা মেয়ে আছে... ও (জাইমা রহমান) বড় হয়ে গিয়েছে এখন। তবে মাঝে মধ্যে ওর সাথে আমি আলাপ করি।
এরপর ঢাকা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, খাগড়াছড়ি, খুলনা, সিলেট অঞ্চলের শিশুদের প্রশ্নেরও জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সিলেটে শিশু অধিকার দিবসের উদ্বোধন
সিলেট ব্যুরো জানায়, গতকাল সিলেটেও শিশু অধিকার দিবস পালন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দিবসটি উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিভাগীয় কমিশনার মো: মশিউর রহমান, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেকসহ বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তা ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা। আরো উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিশু শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীরা।





