মাত্র এক যুগের ব্যবধানে বায়িং হাউজের কর্মী থেকে হয়েছেন বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। বসেছেন তৈরী পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতৃত্বে। তার মালিকানাধীন টিম গ্রুপের অধীনে দেশে রয়েছে তার গার্মেন্ট, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিসহ এক ডজন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আর পাচারের টাকায় কানাডায় গড়ে তুলেছেন বিশাল সাম্রাজ্য। ‘আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ’ হাতে পাওয়া এই ব্যক্তির নাম আব্দুল্লাহ হিল রাকিব। স্বৈরশাসকের প্রভাব-বলয়ে স্বল্প সময়ে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়ার গল্প এখন তার ঘনিষ্ঠদের মুখে মুখে। শুধু দেশে নয়, আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার করে তিনি কানাডার টরেন্টোতে নিজ ও স্ত্রীর যৌথ নামে কিনেছেন তিনটি বিলাসবহুল বাড়ি। চলতি বছর তিন বাড়ির বার্ষিক কর পরিশোধ করেছেন ৩৫ হাজার ৪৩৭ কানাডিয়ান ডলার (৩১ লাখ টাকা)। আরো তিনটি বাড়ি নির্মাণ করতে তিনি টরেন্টো সিটি কাউন্সিল কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছেন। কানাডার স্টক মার্কেটে তার বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, পাচারকৃত অর্থেই তিনি কানাডায় গড়ে তুলেছেন আলিশান সাম্রাজ্য।
জানা গেছে, পুলিশের সাবেক মহাপরির্শক বেনজীর আহমেদের সাথে রাকিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অভিযোগ আছে বেনজীরের বিপুল অর্থ পাচারে রাকিবের যোগসাজস রয়েছে। বিজিএমইএর সভাপতি ও আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক এম এ মান্নান কচির হাত ধরেই তার এই উত্থান। তবে কচি আত্মগোপনে চলে গেলেও রাকিব আছেন বহাল তবিয়তে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভোলপাল্টে বিজিএমইএ এর সিনিয়র সহসভাপতির পদ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। গার্মেন্ট খাতের অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখার নেপথ্যেও তার ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, আব্দুল্লাহ হিল রাকিব নামে কোনো ব্যক্তির বিদেশে বিনিয়োগ করার অনুমোদন সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় রক্ষিত নেই। এ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট তিনি বিদেশে কোনো বিনিয়োগ করে থাকলে পাচার করা অর্থেই করেছেন। যেহেতু তিনি নিজের নামে সম্পদ করেছেন, সেহেতু বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর উদ্যোগ নিলে তার পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, কানাডার টরেন্টো শহরের বিলাসবহুল এলাকায় তিনটি অভিজাত বাড়ির মালিক আব্দুল্লাহ হিল রাকিব ও তার স্ত্রী আফরোজা শাহীন। টরেন্টো মেট্রোপলিটন ল্যান্ড রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল মতে প্রতিটি বাড়ি নিজ ও স্ত্রীর যৌথ নামে কিনেছেন। এ ছাড়া আরো তিনটি বাড়ি ডেভেলপ করার জন্য তিনি টরেন্টোর সিটি করপোরেশনের কাছে আবেদন করেছেন। ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল আবেদনের শুনানি সংক্রান্ত নথিও পাওয়া গেছে।
কানাডার প্রপার্টি সংক্রান্ত দলিলে রাকিব দম্পত্তির বাড়ির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২৪ কিংসবারি ক্রেস, টরেন্টোতে রয়েছে রাকিবের একটি বাড়ি। এই বাড়িটি টরেন্টো মেট্রোপলিটন রেজিস্ট্রি অফিস থেকে রাকিব ও তার স্ত্রী আফরোজা শাহীনের যৌথ নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। ২০১২ সালের ৩০ মে কেনা বাড়িটির মোট আয়তন ৭ হাজার ৭৩০ স্কয়ার ফুট। বাড়ির আঙ্গিনার পাশে দৃষ্টিনন্দন সুইমিং পুল। গাড়ি রাখার জন্য আছে দু’টি গ্যারেজ। চলতি বছর বাড়িটির বিপরীতে সাড়ে ১৮ হাজার কানাডিয়ান ডলার (১ লাখ ৬০ হাজার টাকা) কর পরিশোধ করেছেন রাকিব।
রাকিব-আফরোজা দম্পতির তৃতীয় বাড়িটির সন্ধান পাওয়া যায় স্কারবোরাফের ৯ ইস্ট রোডে। এই বাড়ির মোট আয়তন ৪ হাজার ৪৯০ স্কয়ার ফুট। ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রায় আট লাখ কানাডিয়ান ডলারে (প্রায় পেপ্রণ ৮ কোটি টাকা) তারা এই বাড়িটি কিনেছেন। ২০২৪ সালে বাড়িটির কর পরিশোধ করেছেন ৬ হাজার কানাডিয়ান ডলার (প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা)।
কানাডার একটি সূত্র জানিয়েছে, কানাডিয়ান স্টক মার্কেটে রাকিবের রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ। এইচএসবিসি ব্যাংক হংকং থেকে রয়াল ব্যাংক অব কানাডায় অর্থ স্থানান্তর করা হয়। সেই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে স্টক মার্কেটে।
অনুসন্ধানে দেশে রাকিবের এক ডজন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া গেছে। তৈরী পোশাক শিল্পের বাইরেও বিপুল বিনিয়োগ তার। অভিযোগ আছে- টিম ফার্মাসিউটিক্যাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে। রাজশাহীতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া ঋণের বেশির ভাগ অর্থ কানাডায় পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তদন্ত করলে সব বের হয়ে আসবে।
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে ‘ট্যাক্স ইবো’ নামের একটি বিদেশী বায়িং হাউজের কর্মী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন রাকিব। প্রতিষ্ঠানটির বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। ২০০৭ সালে তিনি প্রথম নিজস্ব কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৭১ সালের আগস্টে জন্ম নেয়া রাকিব এখন বাংলাদেশের টিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- টিম সোর্সিং লি:, গ্রামটেক নিট ডায়িং ফিনিশিং অ্যান্ড গার্মেন্ট ইন্ডা:, সাউথ অ্যান্ড স্যুয়েটার কোম্পানি লি:, ব্রাদার ফ্যাশন লি:, ফোর এ ইয়ার্ন ডায়িং লি:, টিম ফার্মাসিউটিকাল লি:, মারস স্টিচ লি:, টিন এক্সেসরিজ লি:, টুয়েলভ ক্লথিং, ফার্মা আইএমইএক্স লি:, ইনটেলার লি:, টিম ডেভেলপার লি:।
এ দিকে অর্থপাচার এবং কানাডায় বিপুল সম্পত্তি ক্রয়সহ আব্দুল্লাহ হিল রাকিবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তিনি হাসপাতালে রয়েছেন বলে ফোন কেটে দেন।
পাচারের অর্থ দিয়ে কানাডায় বিজিএমইএ নেতার সাম্রাজ্য
মাত্র এক যুগের ব্যবধানে বায়িং হাউজের কর্মী থেকে হয়েছেন বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। বসেছেন তৈরী পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতৃত্বে। তার মালিকানাধীন টিম গ্রুপের অধীনে...





