গবেষণার জন্য আফ্রিকা থেকে দুই দফায় ২২টি উটপাখি এনেছিলেন পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক ড. মো: সাজেদুল করিম সরকার। এর মধ্যে মাত্র ৪টি আছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএলআরআই)। গবেষণার বাকি উটপাখি নাই হয়ে গেছে। এসব পাখির গোশত টেস্টস্বরূপ কর্মকর্তাদের পেটে চলে গেছে বলে জানা গেছে। শুধু উটপাখি নয়। এরআগে গত বছর গবেষণার ৩৮টি মোরগ চুরি হয়ে যায় বিএলআরআই শেড থেকে। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়। তবে সেই প্রতিবেদন আর সামনে আসেনি। সেগুলোও জবাই করে খাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মো: সাজেদুল করিম সরকার জানান, প্রথমে ১৫টি এবং পরে ৭টি মোট ২২টি উঠপাখি আনা হয়। প্রতিটিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে খরচ পড়েছে। খামারে মাত্র ৪টি অবশিষ্ট থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাকি উটপাখির ৪ থেকে ৫টি মারা গেছে। আর বাকিগুলো গবেষণার স্বার্থে গোশতের গুণাগুণ পরীক্ষা করতে জবাই করা হয়েছে।
এ দিকে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সাভারের বিএলআরআই থেকে একটি ‘পিওর লাইন’ মেল শেড থেকে মোরগগুলো চুরি হয়। জানা যায়, শেডে ৩০০টি মোরগ ছিল। শেড থেকে আরআরআই ও হোয়াইট লেগ হর্ন জাতের ৩৮টি মোরগ চুরি হয়। চুরির বিষয়টি প্রথমে গোপন রাখেন কর্মকর্তারা। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। এ বিষয়ে পোলট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পিএসও) ও বিভাগীয় প্রধান ড. শাকিলা ফারুক বলেন, তদন্ত কমিটির আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনিয়মিত শ্রমিক যে ছেলেটি এটি দেখভালের দায়িত্বে ছিল তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
সিসি ক্যামেরা রয়েছে, এত সিকিউরড জায়গায় থেকে কিভাবে চুরি হলো? তদন্তে চুরির জন্য কাউকে চিহ্নিত করা হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ডিজি স্যার আমাকে বলেছিলেন যে, ওই ছেলেকে সরিয়ে দিতে, আমি সেটাই করেছি। এর চেয়ে কিছু জানি না।
অভিযোগের শেষ নেই : বিগত ১৫ বছরে পতিত স্বৈরাচার সরকারের সময় ভিন্নমতকে দমনে মরিয়া ছিলেন মন্ত্রী, সচিব, ডিজিসহ সংশ্লিষ্টরা। গ্রেডেশন ও যোগ্যতার দিকে না তাকিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএলআরআইকে আওয়ামীকরণে ব্যস্ত ছিলেন তারা। ভিন্নমতের অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে শুধু বঞ্চিত নয়, বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেন তারা। টাঙ্গাইলে বাড়ি হওয়ার সুবাদে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের লোক হিসেবে ডিজি নিযুক্ত হন জাহাঙ্গীর হোসেন। তার বিরুদ্ধে চাকরির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত নানা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তিন বছর ডিজির দায়িত্ব থাকাকালে বরাবরই মিডিয়াকে এরিয়ে চলেন এই কর্মকর্তা।
বিগত সময়ে বিএলআরআইতে পিডি নিয়োগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দলীয় বিবেচনা এবং আর্থিক সুবিধায় পিডি নিয়োগের অভিযোগ বেশ পুরনো। গত বছর শেষ হয়েছে বিএলআরআইর ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, চতুর্থ গ্রেড থেকে কোনো কর্মকর্তাকে পিডি নিয়োগ করার কথা থাকলেও তখন পিডি করা হয় ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাকে।
ডিজি হওয়ার দৌড়ে স্বৈরাচারের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে বিএলআরআইতে নানা অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে সরিয়ে দিলে তার স্ত্রী (পরিচালক-গবেষণা) ড. নাসরিন সুলতানা মহাপরিচালক (ডিজি) হওয়ার সিরিয়ালে আছেন। তিনি তৃতীয় গ্রেডের। এর বাইরে আরো কয়েকজন রয়েছেন ডিজি হওয়ার লাইনে। তবে তারা প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পিএসও) বা চতুর্থ গ্রেডের। তাদের মধ্যে ড. শাকিলা ফারুক, ড. মো: জিল্লুর রহমান, বিপ্লব কুমার রায়, ড. মো: সাজেদুল করিম সরকার, ড. রেজিয়া খাতুন, ড. মুহাম্মদ আবদুস সামাদ, ড. পারভীন মোস্তারী রয়েছেন আলোচনায়। ডিজি হওয়ার জন্য তারা জুনিয়র হলেও তাদের কেউ কেউ বিএনপিপন্থী হিসেবে শীর্ষ মহলে যোগাযোগ করছেন। তাদের মধ্যে আবার এমনও রয়েছেন যারা পতিত স্বৈরাচার সরকারের সুবিধাভোগী। বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার সুর পাল্টে বিএনপি-জামায়াত ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের আত্মীয়স্বজনকে কাজে লাগিয়ে ডিজি হওয়ার তদবির করছেন বলে জানা যায়।
নাম না প্রকাশে একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিগত বছরগুলোতে দলীয়করণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (বিএলআরআই) অথর্ব প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া হয়েছে। গবেষণার এই প্রতিষ্ঠানে এই মুহূর্তে একজন ডায়নামিক মহাপরিচালক প্রয়োজন। একমাত্র একজন যোগ্য কর্মকর্তার নেতৃত্বেই আগামীতে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সাভার প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের হালচাল-শেষ পর্ব
কর্মকর্তাদের পেটে গবেষণার প্রাণি
ডিজি হওয়ার দৌড়ে স্বৈরাচারের দোসররা
গবেষণার জন্য আফ্রিকা থেকে দুই দফায় ২২টি উটপাখি এনেছিলেন পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক ড. মো: সাজেদুল করিম সরকার। এর মধ্যে মাত্র ৪টি আছে...





