ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর গত ৫ আগস্ট থেকে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রকাশ্যে না এলেও ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হচ্ছে তারা। দিবস ভিত্তিক কর্মসূচি পালনের ডাক দেয়ার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সক্রিয়ভাবে রাজপথে নামানোর চিন্তা করছে দলটির হাইকমান্ড। গতকাল অনুষ্ঠিত শহীদ নূর হোসেন দিবসের মতো আগামী ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস ও ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে টার্গেট করে এখন থেকেই বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই কর্মসূচিতে ব্যাপক ভিত্তিতে নেতাকর্মীদের জড়ো করার কথা ভাবছে দলটি। এর মাধ্যমে হতাশাগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর পর থেকে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কাউকেই প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। শীর্ষ নেতারা পালানোর পর থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল একেবারে ভেঙে গেছে। হতাশ হয়ে দল ছাড়ার কথাও ভাবছেন কেউ কেউ। এসব তথ্য ইতোমধ্যে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছেছে। তৃণমূল পর্যায়ের ওইসব ত্যাগী নেতাকর্মীদের ধরে রাখার জন্য দিবস ভিত্তিক কর্মসূচি পালনের দিকে নজর রয়েছে দলটির। তারই অংশ হিসেবে গতকাল ১০ নভেম্বর ১৯৮৭ সালের স্বৈরাচার সরকার পতনের নায়ক শহীদ নূর হোসেন দিবসটি পালনের ডাক দেয় দলটির হাইকমান্ড। দলের ভেরিফায়েড ফেসবুকের মাধ্যমে বেলা ৩টায় গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে শহীদ নূর হোসেন চত্বরে সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীদের জড়ো হওয়ার জন্য জোরাল প্রচারণা চালানো হয় এবং নেতাকর্মীদের সেখানে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানস্থলে আসার জন্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে কিভাবে যেতে হবে তারও কিছু বিশেষ দিকনির্দেশনা দেয় আওয়ামী লীগ। অবশ্য জিরো পয়েন্টে জড়ো হতে না পারলেও গুলিস্তান বিআরটিসির মোড়ে, মতিঝিল ব্যাংক পাড়ায় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা বিক্ষোভ মিছিল করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যদিও কেন্দ্রীয় নেতাদের কাউকেই নূর হোসেন চত্বর বা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় কিংবা তার আশপাশে দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির এক নেতা বলেন, এখন কর্মসূচি পালন করা মোটেও সমীচীন নয়। এ ধরনের কর্মসূচির ডাক দিয়ে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলা হচ্ছে। তাদের এভাবে সক্রিয় করার চিন্তা করলেও শেষমেশ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে যারা গ্রেফতার হবেন, হামলা-মামলার শিকার হবেন তাদের কী হবে? দল কি তাদের পাশে এই সময়ে দাঁড়াতে পারবে? দল যদি তাদের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে এসব নেতাকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আরেক নেতা বলেন, দিবস ভিত্তিক কর্মসূচি পালন করার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে রাখার জন্য আপাতত এর বিকল্প নেই। ১০ নভেম্বর আওয়ামী লীগ নূর হোসেন দিবস কর্মসূচি ঘোষণা করার পরই অন্তর্বর্তী সরকারের সব পর্যায়ে বেশ চাপে ছিল এবং অস্বস্তিতে ছিল। গতকাল সচিবালয়ে ছিল কড়া নিরাপত্তা। আওয়ামী লীগকে মাঠে দাঁড়াতে না দেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরাও তৎপর ছিল। এ ধরনের কর্মসূচি সামনের মাসেও পালন করার কথা ভাবা হচ্ছে। আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে আপাতত দিবসভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা ও পালন করার মধ্য দিয়ে থাকতে হবে। অন্যথায় দেশের মানুষও একসময় আওয়ামী লীগকে ভুলতে বসবে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: মিরাজ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, কেন্দ্র থেকে কর্মসূচি পালনের ডাক দেয়া হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের অনেকেই যে যার মতো করে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা কেউ আসেননি। নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ ছিল না। নেতৃত্ব দিতে না পারলে কর্মসূচি সফল করা সম্ভব হয়ে উঠে না। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত আছে। প্রয়োজন নেতৃত্ব। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র ঠিক করা দরকার। আগামীতে কর্মসূচি সফল করতে হলে কার নেতৃত্বে কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে সেটা ঠিক করলে কর্মীদের অভাব হবে না।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এখনকার সময়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো কর্মসূচি পালনের ডাক দেয়া হলো হঠকারী সিদ্ধান্ত। আজকের যে কর্মসূচি তা পালন করতে যাওয়াটাও একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি দেশের জনগণ ইতোমধ্যে বিরক্ত হওয়া শুরু করেছে। মানুষ বলতে শুরু করেছে, আগেই ভালো ছিলাম। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বিকল্প দল হিসেবে জনগণ আওয়ামী লীগকেই আবার বেছে নেবে। কিন্তু এ ধরনের কর্মসূচি পালন, উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ওপর হামলা- এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তার অবস্থান নষ্ট করে ফেলছে। রনি বলেন, আরেকটি দিক হলো ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ছিল। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কথা ভাবছে তাদের উসকানি দেয়া হলো। তারা এখন জোরালোভাবে দাবি জানাবে- আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার জন্য। তারা এখন বলবে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না করলে দেশে আরো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।