গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) পিকনিক বাস বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আজ সোমবার থেকে তিন দিনের শোক ঘোষণা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম এক সপ্তাহ স্থগিত থাকবে। গতকাল রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এদিকে মর্মান্তিক এ ঘটনা তদন্তের কাজ এরই মধ্যে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর গঠিত পাঁচটি পৃথক কমিটি। ওই ঘটনায় ময়মনসিংহ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)-২ এর সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।
পবিসের ৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী সাময়িক বরখাস্ত : গাজীপুরে বোর্ডবাজারের আইইউটির পিকনিক বাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিন শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় ময়মনসিংহ পবিস-২ এর সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ময়মনসিংহ পবিস-২ এর জিএম মো: আকমল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর রাতে পবিসের সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ময়মনসিংহ পবিস-২ এর ডিজিএম (সদর-কারিগরি) কমলেশ চন্দ্র বর্মন, মাওনা জোনাল অফিসের ডিজিএম খোন্দকার মাহমুদুল হাসান, এজিএম মো: তানভীর সালাউদ্দিন, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মতিউর রহমান, লাইনম্যান পারভেজ মিয়া শাখাওয়াত হোসেন ও আবুল কাশেম।
প্রসঙ্গত শনিবার (২৩ নভেম্বর) সকালে ওআইসি পরিচালিত গাজীপুর বোর্ড বাজারে অবস্থিত আইইউটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রায় ৪৬০ শিক্ষার্থী বিআরটিসির ছয়টি ডাবল ডেকার বাস ও তিনটি মাইক্রোবাস নিয়ে পিকনিক করতে শ্রীপুরের তেলিহাটি ইউনিয়নের উত্তর পেলাইদ গ্রামের মাটির মায়া ইকো রিসোর্টেও উদ্দেশ্যে রওনা হন। তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে গ্রামীণ আঞ্চলিক সড়ক ধরে রিসোর্টের পথে যাওয়ার সময় পেছনে থাকা একটি বাস স্থানীয় উদয়খালী বাজারে পৌঁছালে সেখানে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের ১১ কেভি তারের সাথে স্পর্শ হয়। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ওই বাসের তিন শিক্ষার্থী নিহত ও তিন শিক্ষার্থী আহত হন। তারা হলেন- ফেনীর মাস্টারপাড়া এলাকার মোতাহার হোসেনের ছেলে মীর মোজাম্মেল হোসেন নাঈম (২৩), রাজশাহীর রাজপাড়া ডিঙ্গাব এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে জোবায়ের আলম সাকিব (২২) ও রংপুর সদরের ইমতিয়াজুর রহমানের ছেলে মুবতাছিন রহমান মাহিন (২২)। আহত কাবিদুল ইসলাম আলিফ (২২) ও নাফিজ আলম খানসহ (২২) তিনজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মাহিনের দাফন সম্পন্ন
রংপুর ব্যরো জানান, শোকাহত পরিবার, আত্মীয়, স্বজন, প্রিয়জন, শুভানুধ্যায়ী ও সহপাঠীদের অশ্রু আর আহাজারিতে চির বিদায় নিলেন গাজীপুরের শ্রীপুরে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) পিকনিকের দোতলা বাস বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যাওয়া মুবতাছিন রহমান মাহিন। ঘটনাটিকে স্বজনরা অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাজনিত দুর্ঘটনা উল্লেখ করে জড়িত বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টদের যথাযথভাবে আইনের আওতায় আনার দাবি করেছেন।
গতকাল বাদ জোহর রংপুর মহানগরীর জুম্মাপাড়ার নুরুল উলুম করিমিয়া মাদরাসা মাঠে নামাজে জানাজা শেষে মাহিমকে মুন্সীপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। নামাজে জানাজা ও দাফনে তার সহপাঠী, স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ সাহস্রাধিক মানুষ অংশ নেন। এর আগে গত শনিবার রাত দেড়টায় মাহিনের কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায় রংপুর মহানগরীর জুম্মাপাড়ার বাড়িতে। এরপর সিটি করপোরেশনের লাশবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয় তার লাশ। তাকে দেখতে এসে স্বজন, প্রিয়জন, পাড়া-প্রতিবেশী সবার চোখে পানি। কেউই মেনে নিতে পারছেন না এই মৃত্যু।
মাহিনের চাচা হাসানুর রহমান জানান, এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়ার নয়। এটি অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন দায়ী। তিনি বলেন, যেহেতু ওই সড়কে দোতালা বাস চলাচল সম্ভব ছিল না। তাহলে কি টাকা বাঁচানোর জন্য নড়বড়ে দোতালা বাস ভাড়া করেছিল প্রশাসন? ওআইসির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানের কাণ্ডজ্ঞানহীন ভূমিকার জন্য যারা জড়িত তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।
হাসানুর রহমান দাবি করেন, ‘দোতলা বাসের কারণে তারগুলো সরিয়ে বাসগুলোকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তার মানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। তাহলে কেন বাস থেকে সব শিক্ষার্থীকে নামানো হয়নি? ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা সবাই আশা করেছিলাম দায়িত্বপ্রাপ্তরা সবাই হবেন যথাযথ দায়িত্বশীল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা গেল চরম দায়িত্ব অবহেলা! যে পিকনিক স্পটটিতে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করেন সেই স্পটের আশপাশের রাস্তাগুলোতে এভাবে তার ঝুলিয়ে থাকা বিষয়টি মেনে নেয়া যায় না। শুধু পল্লী বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সাতজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারো বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এটাকে আলোর মুখ দেখাতে হবে। একই সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে ভবিষ্যতে যেন এমন মৃত্যু না হয় তা নিশ্চিতে দায়িত্ব সরকারের। সেটি যদি করা যায় তাহলে এই তাজা তিনটি প্রাণ ঝরে পরিবারগুলোতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তারা অন্তত শান্তি পাবে।
মাহিনের পিতা ইমতিয়াজ রহমান ইমন জানান, ‘আমরা চাই না আমার ছেলের লাশ কাটাছেঁড়া করা হোক। কিন্তু আমরা চাই যাদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার।’
মাহিনের পিতা ইমতিয়াজ রহমান আরব বাংলাদেশ ব্যাংক (এবি ব্যাংকের) নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখার ব্যবস্থাপক। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিলেন মাহিন। অপর ভাই ইহান রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। মাহিন আইইউটির মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের উদয়খালী গ্রামে তাকে বহন করা বিআরটিসির দোতল বাসটি ঝুলে থাকা তারে বিদ্যুতায়িত হয়ে মাহিনসহ আইইউটির তিন শিক্ষার্থী মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন আরো তিনজন।





