সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, জর্দান, কাতারসহ শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্য পাড়ি জমানো বাংলাদেশী শ্রমিকদের অনেকেই নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন বলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ জমা পড়ছে জনশক্তি কর্মসংস্থাণ ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অভিযোগ সেলে। এসব অভিযোগের মধ্যে বেশ কিছু শ্রমিক চুক্তি মোতাবেক বেতন পাচ্ছে না। বিশেষ করে সৌদি আরবে গিয়ে আকামা না হওয়ায় অনেককে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। পরবর্তীতে প্রতারিত এসব শ্রমিকের অনেকেই চাকরি না পাওয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি ব্যুরোর সংশ্লিষ্ট সেলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগের তদন্ত শুরু হলেও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে ক্ষতি পূরণের টাকা আদায় করতে পারছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এসব অনিয়মের অভিযোগ শুরুতে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলেও পরবর্তীতে বেশির ভাগ সময় অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের হয়ে প্রতিবেদন দেয়ার চেষ্টা করেন; যে কারণে প্রায় সময় নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে এজেন্সিগুলোর মালিকরা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এদের ছাড় দেয়ার পেছনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তদন্ত সংশ্লিষ্টরা কৌশলে অর্থের বিনিময়ে প্রতারিত কর্মীদের অভিযোগগুলো ধামাচাপা দিয়ে দেন। এসব ঘটনার সাথে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সম্বন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের হয়ে কর্মচারীরা লেনদেনে জড়িয়ে পড়ছেন বলে একাধিক সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার অনেক সময় প্রতারিত শ্রমিকদের ক্ষতি পূরণের টাকা আপস-মীমাংসা করে আদায় করে দেন বিএমইটির কর্মকর্তারা। এর মধ্যে কোন সময় কোন এজেন্সি জনশক্তি ব্যুরোকে পাত্তা না দিলে তখন তাদের লাইসেন্স ব্লক ছাড়াও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ প্রতিবেদন পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্য যাচ্ছেন সৌদি আরবে। যেসব শ্রমিক দেশটিতে পাড়ি জমাচ্ছেন তার মধ্যে অনেকেই গিয়ে চুক্তি মোতাবেক কাজ পাচ্ছেন না। পরে ওই কর্মীদের পক্ষে তাদের স্বজনরা বিএমইটিতে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন। অভিযোগ দেয়ার পর কর্মীরা বারবার শুনানিতে এসে হাঁফিয়ে উঠছেন। বেশির ভাগ সময় এজেন্সি মালিকরা উপস্থিত হন না। তারা প্রতিনিধি পাঠিয়ে বিষয়টি ম্যানেজের চেষ্টা করেন।
গতকাল সৌদি আরবে কর্মী পাঠানোর সাথে সম্পৃক্ত একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নিজের নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, সৌদি আরবে প্রতি বছর পাঁচ-ছয় লাখ শ্রমিক যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু শ্রমিক হয়তো গিয়ে কাজ পাচ্ছে না, আকামা জটিলতা হচ্ছে এটি সত্য। তবে যারা ভালো কোম্পানিতে কর্মী পাঠাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে টাকা একটু বেশি লাগলেও আকামা ও কাজের সমস্যা হয় না। যারা ১০০০ রিয়াল বেতনের স্থলে ১,৮০০ রিয়াল বলে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের পাঠানো কর্মীদের ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে। ওই সব শ্রমিকই হয় দেশে ফেরত এসে, না হয় তাদের স্বজনরা লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন বিএমইটিতে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএমইটিতে অভিযোগ দিলে কী হয় সেটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা অভিযোগ জমা পড়ার পরই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে ফেলেন। একজন কর্মীর কাছ থেকে টাকা নিলো এজেন্সি মালিক পাঁচ লাখ টাকা আর ফেরত দেয়ার সময় সরকারি খরচের দোহাই দিয়ে বলে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা নিয়েছি। এরপর নানা কাহিনী বলে কর্মীকে সামান্য টাকা ফেরত দেয়া হয়। আর এ ঘটনার সাথে বিএমইটির কর্মকর্তারা মাল (টাকা) খেয়ে শাস্তি থেকে ওই এজেন্সিকে বাঁচিয়ে দেন। এগুলো আমরা আগেও দেখেছি, এখনো দেখছি।
গতকাল অপর এক রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক যাচ্ছে ঠিকই। তবে অনেকে বিদেশ গিয়ে আবার প্রতারিতও হচ্ছেন। তবে বিদেশে গিয়ে যেসব কর্মী চাকরি পাচ্ছেন না তরা বিএমইটি এবং মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলেও এজেন্সির বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তি হচ্ছে তা আমরা খুব কমই দেখছি। যদিও অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্স থেকে শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও কর্মীকে পৃথক চিঠি দিচ্ছে। গতকালও কাতার পাঠিয়ে চুক্তি মোতাবেক কাজ না দেয়ার অভিযোগে একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে চিঠি দিয়ে লাইসেন্সের কপিসহ শুনানিতে অংশ নিতে বলেছে টাস্কফোর্স। তবে অনেক সময় বিদেশ গিয়ে শ্রমিকদের সাথে যে ঘটনা হয়নি তাও অভিযোগে তারা উল্লেখ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওই এজেন্সি মালিক নয়া দিগন্তকে বলেন, এ মুহূর্তে ইউরোপে লোক পাঠানোর নামে বহৃরূপী প্রতারক চক্র মাঠে রয়েছে। তারা ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানা মাধ্যমে যোগাযোগ করে পাসপোর্ট ও টাকা আদায় করলেও তাদের অফিস কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। টাকাও ফেরত পাচ্ছে না। এসব বিষয়ে সরকারের আরো কঠোর হওয়া উচিত।
গতকাল জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালকের সাথে এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে পরিচালক বহির্গমনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে রয়েছেন বলে জানান।
এ দিকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে সৌদি আরবের আফরাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে ৩০ জন (পুরুষ-মহিলা) নার্সিং স্পেশালিস্ট নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানিয়েছে। এক্ষেত্রে বিদেশগামীদের বেতন হবে তিন হাজার রিয়াল। আগ্রহীদের বিএসসি নার্সিং এবং প্রোমেট্রিক পরীক্ষা উত্তীর্ণ সনদধারী হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে। আগ্রহী প্রার্থীদের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল থেকে ফ্রি বিদেশ যাওয়ার সুযোগ থাকলেও নির্বাচিত প্রার্থীদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট দফতরের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নানা কৌশলে তাদের জিম্মি করে টাকা আদায় করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও টাকা নেয়ার অন্যান্য মাধ্যম খতিয়ে দেখতে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে দাবি উঠেছে। অনেক সময় বোয়েসের তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে আসা কাজ অন্য রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।





