তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্বাচনী সঙ্কট কেটে গেছে বলে মনে করছে বিএনপি। এ রায় নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের পথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলেও দলটির নেতাদের অভিমত। নেতারা বলেছেন, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে নতুন করে বিএনপির রাজনীতির যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। কারণ জনগণের দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে বিএনপিই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। আর ভোটবিহীন দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকতে পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার আদালতকে ব্যবহার করে এই ব্যবস্থা বাতিল করেছিল।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা গতকাল আলাপকালে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে নজিরবিহীন কারচুপির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতির কাঁধে ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরায় এখন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে কখনো অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।
বিএনপি মনে করে, এখন কী কী সংস্কার আনলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আরো শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হবে, অন্তর্বর্তী সরকার সে ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ নিবে। দলটির প্রত্যাশা, রাজনৈতিক মতৈক্যের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফরম্যাটেরও সমাধান হবে। আর সরকার চাইলে এ ব্যাপারে বিএনপি তাদের মতামত দিবে। সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে বিএনপি তাদের সমর্থনও অব্যাহত রাখবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন জনগণের দাবি ছিল। বিএনপি এটাতে বিশ্বাস করে। এ জন্য বিএনপি আন্দোলন করেছে। বেগম খালেদা জিয়া এ দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যেন জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের ইচ্ছামতো ভোট দিতে পারে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে সফল সিস্টেম, এটা প্রমাণিত। ’৯১-তে জনগণ ভোট দিয়ে বিএনপিকে সরকারে বসায়। ’৯৬-তে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়। আবার ২০০১-এ এই দেশের জনগণই ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে দেশের মানুষ ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করতে পারে, এটার প্রমাণ এ দেশে রয়েছে।
তিনি বলেন, উচ্চ আদালত পঞ্চদশ সংশোধনী যে বাতিল করেছে, সেটি একটি অত্যন্ত ন্যায্য বিষয়। কারণ, একটি রাজনৈতিক দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টুকে একটি দেশের সংবিধানে সন্নিবেশিত করা, একটি দলের নেতার বক্তব্যকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করা সম্পূর্ণ সংবিধানবিরোধী ছিল। উচ্চ আদালত এই রায় দিয়ে জনগণের সেই দাবিকে বাস্তবায়ন করেছেন। জনগণের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য আমরা উচ্চ আদালতকে অভিনন্দন জানাই। এই রায় দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে এবং একটি সুন্দর বাংলাদেশ গঠনে বিরাট ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বিএনপির এই সিনিয়র নেতা।

এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোন ফরমেটে গঠিত হবে, সে বিষয়ে বিএনপির কোনো ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে ড. মোশাররফ বলেন, আমরা এই দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করেছি। আমাদের ধারণা আগেও আছে, এখনো আছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যাপারে কোনো পরামর্শ চাইলে বিএনপি অবশ্যই পরামর্শ দিবে।
খালেদা জিয়া সরকারের সময় ১৯৯৬ সালে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। এরপর নির্বাচনকালীন এই সরকারব্যবস্থার অধীনে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। পরে ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। এর মাস দেড়েক পরেই ৩০ জুন সংসদে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর পর থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহালের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। তখন এটি ছিল বিএনপির এক দফা দাবি। দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল দলটি। কিন্তু ক্ষমতার কোনো হেরফের হয়নি। আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে। এরপরও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অটল থাকে বিএনপি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দলীয় অবস্থান পরিবর্তন করে আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল বিএনপি। কিন্তু সে নির্বাচনে অনাক্সিক্ষত ফল আসে। নির্বাচনের পরপরই তারা বলেছিল, দলীয় সরকারের অধীনে যে কখনো অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তা আবারো প্রমাণিত হয়েছে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং সরকারের পদত্যাগ দাবিতে ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে যুগপৎ আন্দোলনে নামে বিএনপি, যেখানে ৪০টির মতো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এক বছরের আন্দোলনেও দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনও বয়কট করে তারা। তবে ওই নির্বাচনের সাত মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায় ঘটে। তাদের বিদায়ের ফলে নির্বাচনকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিক দীর্ঘমেয়াদি যে জটিলতাগুলো ছিল, আস্তে আস্তে সেগুলোর জট খুলতে থাকে।

বিএনপির রাজনীতির যথার্থতা প্রমাণিত : সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হওয়ার রায় ঘোষিত হওয়ার পর নয়া দিগন্তকে বিএনপি গঠিত নির্বাচন সংস্কারবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘এটাই সত্যি যে, আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে বিএনপিই জনগণের ইচ্ছের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সংসদে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ‘কেয়ারটেকার’ প্রথা প্রবর্তন করেছিল। এ ক্ষেত্রে যা অনুধাবন করতে হবে সেটা হলো- বাংলাদেশের মানুষের সাইকোলজিক্যাল প্যারাডাইম। তারা তাদের নেতৃত্বকে অত্যন্ত ভালোবাসে, এটা যেমন ঠিক, তেমনি আবার তারা একই সাথে ‘অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট’। কাজেই রাজনৈতিক দলের চেয়ে এ দেশের মানুষ রাজনীতিটার ওপরে বেশি আস্থা রাখে; আর এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। তিনি আরো বলেন, বিএনপি জনগণের রাজনীতি করে বলেই কিন্তু জনতার রায় মেনে নিয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে নতুন করে বিএনপির রাজনীতির যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।