ডেঙ্গু ছিল বছরজুড়ে, শেষ দিকে বেড়েছে চিকুনগুনিয়ার আক্রমণ। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেশে এক লাখ এক হাজার ১৩০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫৭৩ জন। এর বাইরেও আরো অনেক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন কিন্তু তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসা না নেয়ায় সরকারি হিসেবে তাদের নাম লেখা হয়নি। ফলে তারা ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের তালিকায় নেই। চিকিৎসকরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়ে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের সংখ্যার চেয়ে বেসরকারিভাবে যারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে গেছেন তাদের সংখ্যা মোটেও কম নয়। ২০২৪ সালে ডেঙ্গু মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির হার ২০২৩ সালের চেয়ে কম। ২০২৩ সালে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় এক হাজার ৭০৫ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু এক তৃতীয়াংশ ছিল। চলতি বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় ডেঙ্গু কম হওয়ার পেছনে কিছু কারণের কথা বলেছেন কীটতত্ত্ববিদরা। মোটা দাগে তারা বলেছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছরের পরিবেশটা মশা তথা ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশার যথেচ্ছ বৃদ্ধির জন্য অনুকূলে ছিল না।

এ ব্যাপারে মহাখালীর জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ববিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার জানান, ‘বৃষ্টি, নির্দিষ্ট মাত্রার তাপমাত্রা, নির্দিষ্ট পরিমাণ সূর্য কিরণ, বায়ুতে নির্দিষ্ট মাত্রার আর্দ্রতা এবং বাতাসের গতির ওপর এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি নির্ভর করে। ২০২৪ সালটি ২০২৩ সালের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। ২০২৪ সালের প্রকৃতি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য খুব বেশি অনকূলে ছিল না। এর বাইরে নানাভাবে যে সচেতনতা কর্মসূচি চালানো হয়েছিল তাতে হয়তো ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে মানুষের তৎপরতা বেড়েছে। যে কারণে ডেঙ্গুর বেড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ হয়তো ছিল না। সে কারণে ২০২৪ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমেছে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত আরো কমে গেলে এটাই প্রমাণিত হবে মানুষের তৎপরতা ও মশার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা কীটনাশক কাজ করেছে। তবে কীটনাশক যে খুব কাজ করেছে তা এভাবে বলে দেয়া যাবে না। এজন্য একটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে হবে বলে জানান ড. মো: গোলাম ছারোয়ার।’ তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রচলিত কীটনাশকগুলোকে পরীক্ষা করে দেখা উচিত যে এগুলোতে সঠিক মাত্রায় অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট (সক্রিয় উপাদান) আছে কি না। অথবা বাংলাদেশে প্রয়োগ করা কীটনাশক এডিস মশা অথবা অন্যান্য মশার বিরুদ্ধে সত্যিই কাজ করছে কি না তা এখনই পরীক্ষা করে দেখা উচিত।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেয়া তথ্যে দেখা গেছে, গতকাল পর্যন্ত ২০২৪ সালে যে ৫৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, ডেঙ্গুর আক্রমণে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে অবস্থিত হাসপাতালগুলোতে। দক্ষিণ সিটিতে মারা গেছে ২৩৮ জন। এর কারণ হলো ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতালের মতো বড় হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে থাকে। এরপরই এককভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অবস্থিত হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জনের। অন্য দিকে ৫৭৩ জনের মধ্যে ৩৯২ জনই ঢাকা বিভাগে হাসপাতালগুলোতে মারা গেছে। ঢাকা বিভাগের বাইরে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে বরিশাল বিভাগে ৬৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৪ জন, খুলনা বিভাগে ৩৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ৮ জন এবং রংপুর বিভাগে ৩ জন। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে। এই তিন মাসের মধ্যে সেপ্টেম্বরে ১৮ হাজার ৯৭ জন, অক্টোবরে ৩০ হাজার ৮৭৯ জন এবং নভেম্বরে ২৯ হাজার ৬৫২ জন আক্রান্ত হয়। চলতি ডিসেম্বর মাসের গত ৩০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬৬১ জন। মৃত্যুর সংখ্যাও এই তিন মাসে বেশি ছিল। যেমন সেপ্টেম্বরে ৮৭ জন, অক্টোবরে ১৩৫ জন, নভেম্বর ১৭৩ জন এবং ডিসেম্বরে মারা গেছে ৮৫ জন। এই চার মাসে মারা গেছে ৪৮০ জন। ডিসেম্বর মাসে বৃষ্টি কমে গেলেও নভেম্বর মাসের জেরে মারা গেছে, অন্য দিকে ইতোমধ্যে ডেঙ্গুর প্রকৃতিতে পরিবর্তন হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।