দীর্ঘ ৬৯ বছর বুখারি শরিফের শিক্ষাদানের বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী শায়খুল হাদিস আল্লামা মুকাদ্দাস আলী ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া রইন্না ইলাইহি রাজিউন। গতকাল বুধবার সকাল ৮টায় তার নিজ বাড়ি জকিগঞ্জ উপজেলার সোনাসার এলাকার বারগাত্তা গ্রামের বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বারগাত্তা গ্রামে ১৩৪০ বাংলার ২০ চৈত্র আনুমানিক ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

মরহুমের নামাজে জানাজা গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় তার নিজ গ্রামের পার্শ্ববর্তী সোনাসার বাসস্টেশনের পূর্ব মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
তার মৃত্যুতে পুরো সিলেটজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সিলেটের প্রবাদপুরুষ ‘মাটিয়া ফেরেশতা’ নামে খ্যাত শায়খুল হাদিস আল্লামা মুকাদ্দাস আলী একজন নিভৃতচারী বুজুর্গ ছিলেন। পার্থিব দুনিয়ার মোহ ছিল না তার মধ্যে। কিতাব অধ্যয়নেই তার ছিল সব আনন্দ-আহ্লাদ। সব প্রশান্তি যেন ছিল সাদা কাগজের কালো হরফগুলোতে, যেখানে লেখা রয়েছে কুরআন মাজিদের আয়াত, তাফসির ও হাদিসের বাণী। জীবনের শেষ সময়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়লেও কিতাবের মায়া এবং ছায়ায় ছিলেন ফুরফুরে। এক দিকে যেমন ইলমে হাদিসের ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য, অন্য দিকে নিভৃতচারিতা ও বুজুর্গিতে অতুলনীয় ছিলেন সিলেটের এই মহান বুজুর্গ। টানা ৬৯ বছর ধরে তিনি সিলেটের নিভৃত পল্লীতে থেকে হাদিসশাস্ত্রের সবচেয়ে বিশুদ্ধ সঙ্কলন সহিহ বুখারি শরিফের দরস প্রদান করে আসছিলেন।

জানা যায়, শিক্ষাজীবনে শায়খুল হাদিস আল্লামা মুকাদ্দাস আলী প্রথমে স্থানীয় সোনাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পাশাপাশি মসজিদের ইমাম মাওলানা মাহমুদ হুসাইনের কাছে কায়দা-আমপারাসহ দ্বীনের বুনিয়াদি শিক্ষা অর্জন করেন। ১৩৬৭ হিজরিতে নানা তাকে ভর্তি করিয়ে দেন বর্তমান ভারতে অবস্থিত বছলার মারকাজুল উলুম ভাঙ্গা মাদরাসায়। ভাঙ্গা মাদরাসার প্রায় সব শিক্ষকই ছিলেন শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ:)-এর সান্নিধ্যধন্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। এখানে নাহবেমীর থেকে জালালাইন পর্যন্ত একটানা আট বছর পড়াশোনা করেন।

শায়খ মুকাদ্দাস আলী দারুল উলুম দেওবন্দে তার লেখাপড়ায় অভূতপূর্ব কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। আল্লামা মুকাদ্দাস আলী যে বছর দাওরা পড়েন, তার মাত্র বছর দুয়েক আগে শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ:)-এর ইন্তেকাল হয়। তাই সরাসরি শায়খ মাদানির ছাত্রত্ব গ্রহণের সুযোগ পাননি। তবে পাঠভুক্ত ক্লাস ছাড়া অন্য ক্লাসে বসার সৌভাগ্য লাভ করেছেন কয়েকবার। দেওবন্দে দাওরা পরীক্ষার পর মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর গিয়ে সেখানে কিছু দিন শায়খুল হাদিস জাকারিয়া (রহ:)-এর সাহচর্য গ্রহণ করেন এবং তার কাছ থেকে বুখারি শরিফের লিখিত ইজাজত লাভ করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পর আল্লামা মুকাদ্দাস আলী দেশে ফিরে আসেন। এর পর ১৩৭৯ হিজরি ১৯৬০ সালে জন্মভূমি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার মুনশিবাজার মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু হয়।

জকিগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি মাওলানা রহমত আলী হেলালী জানান, বাংলাদেশে একাধারে এত দীর্ঘকাল সহিহ বুখারির দারস দিয়েছেন, এমন কোনো শায়খুল হাদিসের নাম আমরা এখনো জানতে পারিনি। ধারণা করা হয়, পুরো উপমহাদেশেও দ্বিতীয় কোনো মনীষী নেই এমন, যিনি এত দীর্ঘকাল বুখারির দারস দিয়েছেন।
বর্তমান সিলেটে খানকাওয়ারি মেহনতের ধারাটি জকিগঞ্জের মুনশিবাজার মাদরাসা মসজিদেই কেবল চালু আছে। আর খানকার পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে ছিলেন আল্লামা মুকাদ্দাস আলী। প্রতি বছর রমজানের শেষ দশকে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন জকিগঞ্জ ছুটে যেতেন তার সাহচর্যে থেকে ইতেকাফ করার জন্য।
ইতোমধ্যে আধ্যাত্মিক তরিকায় বেশ কয়েকজন ব্যক্তিত্বকে তিনি খেলাফত প্রদান করেছেন। তাদের অন্যতম হলেন কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়ার শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুর রহমান জালালাবাদী। তিনি প্রতি বছর রমজানের শেষ দশকে কিশোরগঞ্জ থেকে ছুটে আসতেন শায়খের সাহচর্যে ইতেকাফের জন্য।

পারিবারিক জীবনে মাওলানা মুকাদ্দাস আলী ১৩৮১ হিজরিতে জকিগঞ্জের পরচক নিজ গ্রামের আলহাজ মুহিবুর রহমানের বড় মেয়ে আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। আট সন্তানের মধ্যে তিন মেয়ে শৈশবেই মারা যান। বর্তমানে তিন ছেলে আর দুই মেয়ে রয়েছে।
মরহুমের নামাজে জানাজা গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় তার নিজ গ্রামের পাশের সোনাসার বাসস্টেশনের পূর্ব মাঠে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার ইমামতি করেন মরহুমের বড় ছেলে মাওলানা কামাল আহমদ। জানাজায় সিলেটের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম ও রাজনৈতিক নেতারা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হন। জানাজার উপস্থিতির কারণে প্রায় তিন ঘণ্টা সিলেট-জকিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল।