এইচএমপিভি একটি পুরনো ভাইরাস। এটা করোনা ভাইরাসের মতো বিপজ্জনক নয়, বাংলাদেশে এখনো আসেনি। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাওয়া গেছে বলে বাংলাদেশকে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলছেন চিকিৎসকরা। চীনে এই ভাইরাসটির সংক্রমণে সর্দির মতো ফ্লুর লক্ষণ প্রকাশ করছে। এটা শুধু নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের মানুষের জন্যই বিপদের কারণ হয়ে তাকে। তাদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধরা অন্যতম। চীন ছাড়াও ইউরোপে, অস্ট্রেলিয়ায় এবং এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, উজবেকিস্তানেও পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম মোজাহেরুল হক বলেন, কোভিডের মতো আমরা ঘন ঘন হাত ধুয়ে নেবো, প্রয়োজনে মাস্ক পরব যদি বাংলাদেশে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব ঘটে।
এইচএমপিভি একটি রেসপিরেটরি সিনসাইটাল ভাইরাস (আরএসভি)। শীতের সময় ফুসফুস সংক্রমণের জন্য যে ব্রংকাইটিস হয়ে থাকে এটা সেই ভাইরাস। এই ভাইরাসে যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর ৩০ হাজার শিশু এবং ১৮ হাজার বয়স্ক মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই ধরনের শ্বাসতন্ত্রের রোগ শীতে বেশি হয়। কারণ শীতে মানুষ বেশি সময় ঘরে থাকে বিশেষ করে শীত প্রধান অঞ্চলের মানুষ। শুধুই ঘরে থাকা নয়, ঘরে আমরা একে অপরের খুবই কাছে অবস্থান করি। এ কারণে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সহজেই এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। ২০০১ সালে ডাচ বিজ্ঞানীরা প্রথম শনাক্ত করেন এটি। কিন্তু ভাইরোলজিস্টরা বলছেন, কয়েক শত বছর ধরে এই ভাইরাসটি প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ২০০ ভাইরাসের একটি এটি। পাঁচ বছরের আগ পর্যন্ত কমপক্ষে একবার করে শিশুরা ভোগে।
স্বাস্থ্যবান ও শক্ত-সামর্থ্যদের এটা কোনো সমস্যা তৈরি করছে না। কিন্তু সদ্যজাত অথবা অল্প বয়সী শিশু অথবা বয়স্ক নর-নারী এবং দীর্ঘদিন থেকে লিউকেমিয়া ও রিউম্যাটিক আথ্রাইটিসে ভুগছেন এমন রোগীদের জন্য এই ভাইরাসটি চিন্তার কারণ ঘটতে পারে। শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস রয়েছে যাদের তারা শ্বাসতন্ত্রে দহন অনুভব করতে পারে। অন্য দিকে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের রোগ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
আক্রান্ত হলে আমরা কিভাবে বুঝব?
খুবই অসুস্থ অথবা পরীক্ষা করা ছাড়া এটা বুঝা সম্ভব নয় যে, কেউ এইচএমপিভিতে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ আক্রান্তের ক্ষেত্রে সবারই ঠাণ্ডা-সর্দি, কফ থেকে কাশি, নাক থেকে পানি ঝরতে পারে অথবা সর্দি ভারী হয়ে নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিছুটা জ্বর হতে পারে অথবা গলাব্যথা হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ কেউ বমি করতে পারে অথবা কারো বমির ভাব হতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুব স্বল্প সময় পর সুস্থ হয়ে যায়। দুই থেকে পাঁচ দিন পর লক্ষণ আর দেখা যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাস শরীরে ঢুকলেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাইরাসটিকে ধ্বংস করে ফেলে।
নাক থেকে সোয়াব (নাকের শ্লেষ্মা) নিয়ে কোভিড-১৯ টেস্টের মতো এন্টিজেন দিয়ে জানা যায়। এ ছাড়া কেউ কেউ চাইলে উচ্চ প্রযুক্তির পিসিআর টেস্ট করে জানতে পারেন।
চীনে কি মহামারী দেখা দিয়েছে?
এইচএমপিভি সংক্রমণ সাধারণত শীতকালেই ঘটে। চীনে এই সংক্রমণের হার যেহেতু বেশি সে কারণে ব্রিটিশ এক্সপার্টরা বলছেন যে, তবু এটা হয়তো মহামারী হবে না। কারণ এইচএমপিভি ভাইরাসটি অন্যান্য সর্দি-কাশি সৃষ্টিকারী ফ্লু অথবা কোভিড ভাইরাসের চেয়ে অনেক ধীরগতিতে নিজের মধ্যে রূপান্তর করতে পারে। যদিও বলা হচ্ছে, এখনকার এইচএমপিভি ভাইরাসটির সংক্রমণ একটি স্ট্রেইনের মাধ্যমে ঘটেছে কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর কোনো প্রমাণ এখনো তারা পাননি। এ ধরনের অন্যান্য স্ট্রেইনের মধ্যে মিল রয়েছে এবং আমাদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যথেষ্ঠ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। তবে সময়ের ব্যবধানে এইচএমপিভি রূপান্তর হচ্ছে, নতুন স্ট্রেইনের আবির্ভাব হচ্ছে, তবু এটাকে মহামারী হতে পারে এমন ভাইরাস হিসেবে বিবেচনা করেন না বলে ইউকেভিত্তিক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. অ্যান্ড্রু ক্যাচপোল জানিয়েছেন ডেইলি মেইলকে। উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানটি সংক্রামক ব্যাধির ভ্যাকসিন তৈরিতে ভূমিকা পালন করে থাকে।
এটা কিভাবে ছড়ায়?
অন্য ঠাণ্ডাজনিত ভাইরাস, ফ্লু অথবা কোভিড ভাইরাসের মতো বায়ুতে ভেসে বেড়ায় এইচএমপিভি এবং একজন থেকে আরেকজনের সংস্পর্শে ছড়ায়। এই ভাইরাসটি ফুসফুসের মাধ্যমে ঘুরে বেড়ায় যেখানে এটি স্বাস্থ্যকর কোষকে সংক্রমিত করে বংশবৃদ্ধি ঘটায়। ঠাণ্ডা অথবা ফ্লুর মতো সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে নাক, চোখ, মুখের মাধ্যমে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করে, যেমন করোনা ভাইরাস করে থাকে। করোনা ভাইরাসের সময় আমরা যে সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম সেগুলোই করতে বলেছেন চিকিৎসকরা।





