আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জুনাইদ আহমেদ পলক। দুর্নীতি ও লুটপাটও করেছেন তিনি পলকে পলকে। ঢাকঢোল পিটিয়ে ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে চটকদার নাম দিয়ে একের পর এক প্রকল্প আর কর্মসূচি হাতে নিয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ২১ প্রকল্পে ২৫ হাজার কোটি টাকা হরিলুট করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতন ঘটলে এই খাতের দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র সামনে চলে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাগ্রহণ করার পরই অর্থনীতিতে দুর্নীতির যে শ্বেতপত্র প্রকাশ হয় তাতেও সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত হয় আইসিটি খাত।
জুনাইদ আহমেদ পলক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে এ খাতে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিয়োগ বাণিজ্য আর বিশেষ বরাদ্দ টি-আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের নামে অর্থ লুটপাট করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ওই অর্থে নিজ এলাকা নাটোরের সিংড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে গড়ে তোলেন বিপুল সম্পদ। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বাইরে তার অঢেল সম্পদ থাকলেও গত ১৫ বছরে আইসিটি খাতের কোনো কাজই তেমন আগায়নি। তেমন সুফলও মেলেনি। পূর্বের কাজ সম্পন্ন না করেই আরেক টেন্ডার, এক সফটওয়্যার বানাতে ৩ কোম্পানিকে কাজের সুযোগ দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ভুঁইফোঁড় ভেন্ডরের মাধ্যমেই লুটপাট হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। পলকসহ সংশ্লিস্টদের ভয়াবহ এসব দুর্নীতি পিছিয়ে দিয়েছে ডিজিটালাইজশেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের ২১টি প্রকল্পে হরিলুটের প্রমাণ পায় অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি। এসব প্রকল্পে কেনাকাটা থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ- প্রতিটি প্রকল্পের দুর্নীতির নকশা প্রণয়ন করতেন পলক। তার নির্দেশনায় প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, কনসালট্যান্ট ও ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে কেনাকাটা সবই করা হতো। পকেট ভরতে এক কাজ বারবার করা হয়েছে। আবার একই প্রকল্প দুই মন্ত্রণালয়ে গ্রহণ করেও সরকারের অর্থ অপচয়ের তথ্য তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় উঠে আসে, টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি খাতে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ নিয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এরপরও জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সের জুন, ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১০০ মধ্যে ৬২ স্কোর করেছে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম ও ভুটানের পরে বাংলাদেশের অবস্থান। ওকলা স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্স মে, ২০২৪ এর ইন্টারনেট গতির তালিকায় ১৪৭ দেশের মধ্যে ইন্টারনেট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। এ ক্ষেত্রে কেনিয়াও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে, পাশাপাশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান ১০৮তম। তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, রুয়ান্ডা, ঘানাও বাংলাদেশের উপরে। আইএমএফের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুতি সূচকে জুন, ২০২৪ পর্যন্ত ১৭৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৩তম, তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, রুয়ান্ডা, ঘানাও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সার্ফশার্ক ডিজিটাল কোয়ালিটি অব লাইফ ইনডেক্স ২০২৩ এর ডিজিটাল জীবনমান সূচকে বিশ্বের ১২১টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮২তম। এক্ষেত্রে আগের বছরের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়েছে পাঁচ ধাপ।
সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেটের গতি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ৫% কম। মার্কিন সাময়িকী সিইও ওয়ার্ল্ডের এপ্রিল, ২০২৪ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ফ্রিল্যান্সিংয়েও পিছিয়ে বাংলাদেশ। সেখানে সেরা গন্তব্যের ৩০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২৯ নম্বরে। তালিকায় ভারত, পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের অবস্থান।