দেশে সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন হয় চলমান বোরো মৌসুমে। চলতি জানুয়ারি মাস থেকে যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে সার সঙ্কট দিয়ে এ মৌসুমের শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কৃষককে বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে সার। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির তথ্য বলছে, এই চলমান বোরো মৌসুমে ইউরিয়া সার ও এমওপির কোনো ঘাটতি নেই। তবে ঘাটতি রয়েছে ডিএপি ও টিএসপি সারের।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলমান বোরো ধান আবাদের ভরা মৌসুম। এই সময় তথা ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ৭ লাখ ৫৫ হাজার ২৮১ টন। এর বিপরীতে গুদামে মজুদ আছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন। আর পরিবহনাধীন আছে প্রায় ৩ লাখ টনের কিছু বেশি। এই মিলে মোট ইউরিয়া সার রয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে বেশি রয়েছে ইউরিয়া সার। একইভাবে এমওপি সারের মজুদও যথেষ্ট রয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬২ টন। গুদামে মজুদ আছে ৬৮ হাজার ৩২৮ টন। আর পরিবহনাধীন রয়েছে আরো ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৭৮ টন। একইভাবে টিএসপি সারের ঘাটতি রয়েছে চাহিদার প্রায় অর্ধেক। চাহিদা ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৯ টন। গুদাম ও পরিবহনাধীন দেশে আছে প্রায় ৯৫ হাজার টন।
বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, সবচেয়ে বড় শঙ্কা দেখা দিয়েছে ডিএপি সার নিয়ে। আগামী তিন মাসে এই সারের চাহিদা ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৪ টন। গুদামে মজুদ আছে মাত্র ১০ হাজার ৪০১ টন। আর পরিবহনাধীন আছে ৩০ হাজার ৯৭১ টন। সবমিলে দেশে ডিএপি সার রয়েছে ৪১ হাজার ৩৭২ টন। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৬ গুণ কম রয়েছে ডিএপি সার।
বিএডিসির আমদানিকৃত টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের মজুদ, পরিবহন, বিক্রয়, এলসি ও জাহাজে পরিবহনাধীন সারের তথ্য বিশ্লেষণে করে এসব তথ্য জানা গেছে। বিএডিসির তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে জাহাজে পরিবহনাধীন সারের মধ্যে ৯০ হাজার টন টিএসপি, ১ লাখ ৩০ হাজার টন এমওপি এবং ৮০ হাজার টন ডিএপিসহ মোট প্রায় ৩ লাখ টন নন ইউরিয়া সার রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই সারা দেশে পুরোদমে বোরো ধান আবাদ শুরু করবেন কৃষকরা। এ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি সারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও ৩-৮ টাকা বেশি দামে প্রতি কেজি সার কিনতে হচ্ছে কৃষককে। সরকারিভাবে কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকি মূল্যে প্রতি কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। তবে বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৮-৩২ টাকা, টিএসপি ৩০-৩৫ টাকা, ডিএপি ২৫-৩৫ টাকা এবং এমওপি ২৫-৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেও তা থামছে না। ডিলাররা বলছেন, সারের সরবরাহ আগের চেয়ে কম থাকায় তারা বেশি দামে বিক্রি করছেন।
দেশে ইউরিয়ার বার্ষিক চাহিদা ২৭ লাখ টন, টিএসপি ৭.৫ লাখ টন, ডিএপি ১৫ লাখ টন এবং এমওপি ৯.৫০ লাখ টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে। কারণ বোরো ধান, আলু ও পেঁয়াজসহ রবি মৌসুমের অধিকাংশ ফসলে এ দুই মাসে সারের প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, জানুয়ারি মাসে ইউরিয়া ৪.১৯ লাখ টন, টিএসপি ১.১৫ লাখ টন, ডিএপি ২.৬৮ লাখ টন এবং এমওপির ১.৪৫ লাখ টন চাহিদা রয়েছে। আর ফেব্রুয়ারি মাসে চাহিদা রয়েছে ইউরিয়া ৪.৩৯ লাখ টন, টিএসপি ৮০ হাজার টন, ডিএপি ১.৪৪ লাখ টন এবং এমওপি ৬৫ হাজার টন।
এ বিষয়ে সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক নয়া দিগন্তকে বলেন, বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি সার প্রয়োজন। কিন্তু এখনো কৃষককে বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। গত সরকারের শেষ ছয় মাসে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে না পারায় সার আমদানিতে সমস্যা হয়েছিল। এর প্রভাব এখনো রয়েছে। সরকারকে আরো মনোযোগী হতে হবে। কৃষকরা যেন সহজভাবে সার পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই আমরা সার সঙ্কটের কথা বলছি। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা এতে পাত্তাই দিচ্ছে না। দ্রুত সময়ের মধ্যে সার আমদানির ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ, বোরো খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। এটিকে সঙ্কটে ফেলা উচিত হবে না। তাহলে দেশে খাদ্যসঙ্কট দেখা দেবে।
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে এ বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত সারের যে মজুদ আছে, তা দিয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুন্দরভাবে চলে যাবে। সার পাইপলাইনে আছে। এটা নিয়মিত আসছে এবং ব্যবহার করছে। নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, সারে কোনো সমস্যা হবে না।





