- সচিবালয় স্থাপনে একটি স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করতে হবে
- পৃথক অবকাঠামো, জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে
- বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাব
বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে পৃথকীকরণে পৃথক সচিবালয় স্থাপনসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। এতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপনের জন্য একটি স্বতন্ত্র আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে।
গত ১৫ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ে কমিশনের যে সামারি প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে ঘোষিত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের মূলনীতিকে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে অর্থবহ ও কার্যকররূপে বাস্তবায়নে কমিশন নিম্নরূপ প্রস্তাব করছে- ‘(ক) বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে পৃথকীকরণের নিমিত্তে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন করতে হবে। (খ) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপনের নিমিত্তে একটি স্বতন্ত্র আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করতে হবে। (গ) রুলস অফ বিজনেস, ১৯৯৬ যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে। (ঘ) অ্যালোকেশন অফ বিজনেস সংশোধনপূর্বক আইন ও বিচার বিভাগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যপরিধি পৃথকীকরণপূর্বক নিজ নিজ কার্যপরিধি সন্নিবেশিত করতে হবে। (ঙ) বিচার বিভাগের দাফতরিক কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্তে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নির্দেশমালা প্রণয়ন করতে হবে। (চ) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য পৃথক জনবল কাঠামো সংবলিত সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তুত ও অনুমোদন করতে হবে। অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত জনবলের পদ সৃষ্টিসহ টিওঅ্যান্ডইতে অন্তর্ভুক্ত অফিস সরঞ্জামাদির প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। (ছ) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য পৃথক অবকাঠামো, জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে।’
বিচার-কর্মবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, (ক) বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিতমতে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রদানকারী ভূমিকা পরিবর্তন করতে হবে এবং বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি এবং বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধাদি নিয়ন্ত্রণ) ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম, কোর্টের উপর ন্যস্ত করতে হবে। (খ) মাসদার হোসেন মামলায় প্রদত্ত ১২ দফা নির্দেশনার আলোকে প্রণীত বিভিন্ন চাকরি বিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে, যাতে করে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত মৌলিক বিধান তাতে প্রতিফলিত হয়। (গ) বিচার-কর্মবিভাগের প্রবেশ পদে নিয়োগের সুপারিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্য পরিধির বিস্তৃতি ঘটিয়ে অ্যাটর্নি সার্ভিসের প্রবেশ পদে নিয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে ওই কমিশনের নাম পরিবর্তন করে ‘লিগ্যাল এন্ড জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন’ রূপে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এর জন্য সংবিধানে আনুষঙ্গিক বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে অথবা বিদ্যমান সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। (ঘ) উপরের প্রস্তাবমতে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার যথাযথ ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং সমগ্র বিচার বিভাগের প্রশাসনিক, আর্থিক এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে বিদ্যমান সংবিধানের ৭৯ অনুচ্ছেদের (সংসদ সচিবালয়) অনুরূপ বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ ছাড়া বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্প্রসারণের প্রস্তাব করেছে কমিশন।
বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাব : হাইকোর্ট বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘রাজধানীর বাইরে প্রশাসনিক বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের জন্য নিম্নবর্ণিত আইনগত বৈশিষ্ট্য ও বান্ধব বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন ও সংশোধনের মাধ্যমে যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হচ্ছে :
(অ) প্রত্যেকটি স্থায়ী বেঞ্চ কোন কোন এলাকা থেকে উদ্ভূত মামলা গ্রহণ করতে পারবে তা সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। তবে, বিচার কার্য পরিচালনা এবং রায়, আদেশ, নির্দেশ ইত্যাদি প্রদানের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ারের পূর্ণাঙ্গতা বা অবিভাজ্যতা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, স্থায়ী বেঞ্চগুলো স্থাপনের কারণে দেশব্যাপী কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার কোন ভৌগলিক সীমারেখা দ্বারা বিভাজিত হবে না এবং রাষ্ট্রের একক চরিত্র ক্ষুণœ হবে না। এর ফলে বিচারপ্রার্থী জনগণ তাদের নিকটতম স্থায়ী বেঞ্চে মামলা দায়েরের সুবিধা পাবে।
(আ) সংবিধানে এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় সুস্পষ্ট বিধান থাকবে যে, কোনো মামলার বিষয়বস্তু, যেমন : মামলার পক্ষদের ঠিকানা/অবস্থান, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির অবস্থান, মামলার কারণ উদ্ভূত হওয়ার স্থান, ইত্যাদি, যেকোনো একটি বিষয়ের সাথে কোন স্থায়ী বেঞ্চের আওতাধীন ভৌগোলিক এলাকার সংশ্লিষ্টতা থাকলে ওই বেঞ্চ মামলাটি গ্রহণ করতে পারবে। তবে মামলার বিষয়বস্তু বিবেচনার ক্ষেত্রে বা মামলায় আদেশ, নির্দেশ, রায় প্রদানের ক্ষেত্রে ওই বেঞ্চের কোন ভৌগোলিক সীমারেখা থাকবে না, অর্থাৎ, মামলায় বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমগ্র বাংলাদেশের উপর ওই বেঞ্চের পূর্ণ এখতিয়ার থাকবে। ফলে, হাইকোর্ট বিভাগের একক কাঠামো এবং রাষ্ট্রের এক-কেন্দ্রিক চরিত্র বজায় থাকবে। (ই) প্রধান বিচারপতি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা কোনো স্থায়ী বেঞ্চে বিচারাধীন মামলার কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো যৌক্তিক কারণে বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে ওই মামলা অন্য কোনো যথাযথ বেঞ্চে স্থানান্তর করতে পারবেন। (ঈ) স্থায়ী বেঞ্চগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আদালত ও সহায়ক কার্যালয়, বিচারক ও সহায়ক জনবলের জন্য উপযুক্ত বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। (উ) সবগুলো স্থায়ী বেঞ্চ একই সাথে কার্যকর করা কঠিন বিবেচিত হলে প্রয়োজনে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় সদরদফতরগুলোতে স্থায়ী বেঞ্চ কার্যকর করা যেতে পারে।
উপজেলা পর্যায়ে আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণ : কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য কমিশন প্রস্তাব করছে। (ক) উপজেলা সদরের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য, জেলা-সদর থেকে দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যবস্থা, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বিন্যাস এবং মামলার চাপ বিবেচনা করে কোন কোন উপজেলায় আদালত স্থাপন করা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করতে হবে। খ) বর্তমানে যেসব স্থানে চৌকি আদালত আছে, সেগুলো সচল রাখার প্রয়োজন আছে কি না। ভৌগোলিক এখতিয়ার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন আছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। বা সেগুলির (গ) বাস্তবতার নিরিখে উপজেলা-সদরে স্থাপিত কোনো আদালতের জন্য একাধিক উপজেলাকে সমন্বিত করে অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করার প্রয়োজন হলে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। (ঘ) উপজেলা আদালতগুলোতে সিনিয়র সহকারী জজ পর্যায়ের বিচারকদের পদায়ন করতে হবে এবং তাদের উপর দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় প্রকার এখতিয়ার অর্পণ করতে হবে। (ঙ) উপরের (ঘ) দফা অনুসারে বিচারক নিয়োগের আগে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, জনবল, প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট এবং বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে বিচার ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পূর্বে বিদ্যমান সব চৌকিতে অবকাঠামো, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। (ঙ) সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে অধিকতর সফল করার জন্য সিনিয়র সহকারী জজদের আর্থিক এখতিয়ার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। (চ) আইনগত সহায়তা কার্যক্রম এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, বিশেষত মধ্যস্থ্যতা পদ্ধতি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে হবে।
আগামীকাল ৩১ জানুয়ারি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে কমিশনের সদস্য তানিম হোসেইন শাওন বলেন, আগামী ৩১ জানুয়ারি কমিশনের প্রতিবেদন দেয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, গত ১৫ জানুয়ারি আমরা সামারি প্রতিবেদন আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন প্রস্তাবে সংবিধানের কি কি সংস্কার করতে হবে সেটাও আমরা বলে দিয়েছি। এটা আমাদের প্রতিবেদনে থাকবে সে বিষয়ে আমাদের কাজ চলছে।





