ঢাকার ৯০ শতাংশ রাস্তার প্রশস্ততা ৯০ শতাংশের কম। ফলে অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরের যানজট কমাতে অত্যন্ত কম প্রশস্ত এসব রাস্তা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। রাস্তার কম প্রশস্ততা ছাড়াও ঢাকার যানজটের পেছনে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা রিকশা। কম প্রশস্ত রাস্তার বেশির ভাগই থাকে রিকশার দখলে। পুরো রাস্তা দখল করে রিকশা চলাচল করে বলে দ্রুতগতির বাস, টেম্পো অথবা প্রাইভেট কারগুলো দ্রুত যাতায়াত করতে পারে না। ফলে ১০ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। ঢাকার যানজট নিরসনে ২০২২ থেকে ৩৫ সাল পর্যন্ত চলমান ঢাকার ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) কম গতিসম্পন্ন রিকশাকে মেইন রোডে প্রবেশাধিকার বাতিল করে গলিতে চালানোর সুপারিশ করেছে। এ ব্যাপারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, মেইন রোডে রিকশার পরিবর্তে ডিটেল্ড এরিয়া প্ল্যানে বাইসাইকেল ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। রিকশা চলবে অপেক্ষাকৃত কম প্রশস্ত রাস্তায় যে রাস্তা দিয়ে বাস অথবা যাত্রী পরিবহনে সক্ষম কোনো যান চলাচল করতে পারে না।’
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, মেইন রোডে রিকশার পরিবর্তে বাইসাইকেল ব্যবহার করলে যানজট হবে না, দ্রুতগতির গাড়িগুলো দ্রুত চলাচল করতে পারবে। একই সাথে নগরবাসীর স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য কিছু রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ব্যায়াম করার জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হবে না। এ ছাড়া বাইসাইকেলের ব্যবহার বাড়লে শহর অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন থাকবে এবং বায়ুদূষণ কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা শহর গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। যেখানে যেটুকু রাস্তা না করলেই নয়, সেখানে সেটুকু রাস্তার জন্য জায়গা রাখা হয়েছে। ‘জনসংখ্যা বাড়লে যে যানবাহন বাড়বে, তখন আরো বেশি যান চলাচলে প্রশস্ত রাস্তার প্রয়োজন হবে’ সে চিন্তা না করেই ঢাকার অধিকাংশ রাস্তা গড়ে উঠেছে।
২০২২ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নযোগ্য ড্যাপে রাস্তার তথ্য থেকে দেখা যায়, সমগ্র রাজউক এলাকায় মাত্র ১০ শতাংশেরও কম রাস্তা ২০ ফুট অথবা এর চেয়ে বেশি প্রশস্ত। ঢাকার মোট রাস্তায় দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ৮৯৮ কিলোমিটার। এই ১৩ হাজার ৮৯৮ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৩৬.২৩ শতাংশ রাস্তা ৮ ফুট বা এর বেশি প্রশস্ত। ৮ ফুট রাস্তায় কোনো বাস প্রবেশ করতে পারে না। ফলে সেসব রাস্তায় রিকশা অথবা এর মতো ছোট যানবাহন চলাচল করবে- এটিই স্বাভাবিক। ঢাকার কয়েক লাখ রিকশা ছোট রাস্তা থেকে মেইনরোডে এসে পড়লেই দেখা দেয় প্রচণ্ড যানজট। তা ছাড়া পায়ে টানা অথবা অন্য কোনো কারণে রিকশাওয়ালারা ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলতে অভ্যস্ত নয়।
পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, একসময় রিকশার জন্য আলাদা লেন করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো খুব বাস্তবসম্মত ছিল না। ফলে রিকশাওয়ালারা তার নির্দিষ্ট লেন থেকে বের হয়ে চলাচল করতে শুরু করে। ফলে লেন করে দেয়ার পর যানজটের উন্নতি হয়নি। ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা কম হওয়ায় তারা রিকশা নিয়ন্ত্রণে সময় দিতে পারেনি। ফলে ওই উদ্যোগটি সফল হয়নি।
এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ বুয়েটের অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দিন বলেন, ড্যাপে যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করলে অর্থাৎ রিকশাকে অপ্রশস্ত রাস্তায় আটকে দিলে তারা আর মেইন রোডে চলতে পারবে না। ফলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে অথবা আগের মতো রিকশার জন্য আলাদা লেন করে দিয়ে রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই যানজটের উন্নতি হবে। রিকশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পুলিশ পাওয়া না গেলে প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা যেতে পারে, যারা তাদের পড়াশোনার পার্ট হিসেবে ট্রাফিস নিয়ন্ত্রণে আসবে মাসে এক দিন অথবা দুই দিন এবং ব্যবহারিক হিসেবে পরীক্ষায় নম্বর দেয়া হলে তারাও কাজ করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। পরিকল্পনাবিদ মুসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘যে প্রকারেই হোক, ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। পরিকল্পনা করে এগুলো আবারো ঢাকাকে একটি সচল শহরে পরিণত করা যাবে।’





