- ওষুধের মেশিন প্রস্তুতের কাঁচামাল আনলে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ ডিউটি
- ষ পুরো মেশিন আমদানি করলে ডিউটি ১ শতাংশ

ওষুধের মেশিন অথবা যন্ত্রাংশ প্রস্তুতের কাঁচামাল আনলে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ডিউটি (শুল্ক) আরোপ করা হয়। অন্য দিকে একই ধরনের মেশিনের পুরো সেটআপ আমদানি করলে মাত্র ১ শতাংশ ডিউটি দিয়ে আনা যায়। বৈষম্যমূলক ডিউটির কারণে এ শিল্পটি দেশে বিকাশ লাভ করতে পারছে না। দেশীয় উদ্যোক্তারা হতাশায় ভুগছেন। দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতি এভাবে ডিউটি আরোপ অব্যাহত থাকলে দেশে ওষুধ শিল্পের মেশিন প্রস্তুত করতে আর কোনো উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশীদের সহায়তায় ও বিনিয়োগে একটিমাত্র কোম্পানি দেশে ওষুধ শিল্পসহ খাদ্য, পানীয় ও কসমেটিকস শিল্পের মেশিন উৎপাদন করছে। কিন্তু সরকারের বৈষম্যনীতির কারণে তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বিদেশীরা তাদের বিনিয়োগ নিয়ে চলে যেতে পারে এবং সেই সাথে বিদেশীদের উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে উদ্যোক্তারা বলছেন। এ প্রসঙ্গে গতকাল কথা বলছিলেন পূর্বাচলে চলমান ‘১৬তম এশিয়া ফার্মা এক্সপো’তে অংশগ্রহণকারী ‘সুইস বায়োহাইজেনিক ইক্যুইপমেন্ট লিমিটেডের’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোসাদ্দেক মাহমুদ রিজওয়ান। তিনি বলেন, সুইস বায়োহাইজেনিক ওষুধের মেশিন প্রস্তুতকারী একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি। ওষুধ শিল্পের ভালো অবস্থা দেখে তারা বাংলাদেশে মেশিন প্রস্তুতে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে কাজ করছে। বাংলাদেশে এই কোম্পানির ৫০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে ইনসেপ্টা ফার্মার। নামে সুইস হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি বাংলাদেশ-জার্মান যৌথ উদ্যোগের কোম্পানি। এখানে যারা কাজ করেন তারা সবাই প্রকৌশলী এবং ওষুধের মেশিন প্রস্তুতের প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে জার্মানি থেকে প্রশিক্ষিত। এই কোম্পানিটি ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করলেও লাভের মুখ দেখতে বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ হিসেবে মোসাদ্দেক মাহমুদ জানান, ওষুধের মেশিন প্রস্তুতের জন্য বিদেশ থেকে ছোট যন্ত্র অথবা যন্ত্রাংশ অথবা কাঁচামাল কিনে আনতে হয়।
সেসব যন্ত্রই তারা বিদেশ থেকে আনেন যেগুলো তৈরি করার প্রযুক্তি বাংলাদেশ নেই এবং আপাতত এখানে তৈরি করা সম্ভব না। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এসব যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানিতে ২৫ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত নানা ধরনের ডিউটি দিয়ে ব্যবসা ব্যাহত করছে বলে অভিযোগ করেছেন উদ্যোক্তারা। কোম্পানিটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য মাঝে মধ্যে মুনাফা ছাড়াই মেশিন সরবরাহ করতে হয়। বাংলাদেশ শীর্ষ প্রায় সবগুলো ওষুধ কোম্পানি সুইস বায়োহাইজেনিকের উৎপাদিত মেশিন ব্যবহার করছে। এখানে জার্মান কোম্পানি ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ করে এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে কাজ করছে। তারা যদি মুনাফা না পায় তাহলে বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়ে চলে যেতে পারে। বাংলাােদশের অধিকাংশ মানুষ যেখানে জানে যে, বাংলাদেশ কোনো মেশিন প্রস্তুত করতে পারে না, মেশিন আমদানি। কিন্তু আমরা এখানে ওষুধ শিল্পসহ আরো কয়েকটি শিল্পের জন্য মেশিন প্রস্তুত করছি। আমরা চাই, আরো অনেক কোম্পানি এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগে এগিয়ে আসুক এবং আমাদের শিল্পের মেশিন আমরাই উৎপাদন করতে চাই। অনুকূল পরিবেশ থাকলে এবং সরকারি সুবিধা বাড়ালে এই শিল্পের কারণে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একই মেশিনের পুরো সেটআপ যদি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় তাহলে তাদের মাত্র ১ শতাংশ ডিউটি দিতে হয়। ফলে অনেক কোম্পানি আমাদের কাছ থেকে কেনার চেয়ে আমদানি করতে বেশি উৎসাহ বোধ করে বলে জানান মোসাদ্দেক মাহমুদ রিজওয়ান। কী কী ডিউটি আরোপ করা হয় জানতে চাইলে তিনি জানান, এখানে মেশিন প্রস্তুত করা হলে যেসব যন্ত্রাংশ আনতে হয় এবং যে কাঁচামাল আনতে হয় সেগুলোতে কাস্টমস, এআইটি, রেগুলেটরি ডিউটি আরোপ করা হয় ২৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত। এ ব্যাপারে এনবিআরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে কিন্তু সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি আশা করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ওষুধ প্রস্তুতের মেশিনের জন্য এআইআসআই ৩১৬এল কোড মেনে চলতে হয়। মেশিন প্রস্তুতের জন্য যে স্টিল ব্যবহার করা হয় সেখানে সালফার, আয়নর, কার্বন, নিকেল মলিবডেনাম, ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি থাকতে পারবে না। এমন স্টিল ব্যবহার করতে হবে যেন তা কোনোভাবেই মরিচা না ধরে। এই কোড মেনে মেশিন প্রস্তুত করতে বিশেষভাবে দক্ষ প্রকৌশলী যেমন লাগে, তেমন উন্নত প্রযুক্তি লাগে। জার্মানির এএমএস টেকনোলজি সেই প্রযুক্তি সুইস বায়োহাইজেনিককে দিচ্ছে।