জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন নয়, এমন অবস্থানের কথা নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে বিএনপি। এর কারণ হিসেবে দলটির শীর্ষ নেতারা বড়দাগে তিনটি বিষয়ের কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, দলীয় প্রতীকবিহীন স্থানীয় নির্বাচন আগে হলে পতিত ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার একটি বড় প্লাটফর্ম হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। এতে করে দেশজুড়ে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেটি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আর এটি সরকারের যে মূল ফোকাস জাতীয় নির্বাচন, সেই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে।
বিএনপি নেতারা মনে করেন, পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের নানামুখী ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষিতে অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই হতে পারে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
চলতি বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় নির্বাচন আগে, না স্থানীয় নির্বাচন আগে হবে সেটি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেয়া ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’-এর প্রতিবেদনেও জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছে।
গত সপ্তাহে ইউএনডিপিসহ উন্নয়ন সহযোগী ১৮টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধির সাথে বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবুল ফজল মো: সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, দুটো নির্বাচন এক সাথে করা যায় কি না, এতে কেমন সময় লাগতে পারে- বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সবকটি স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ধাপে ধাপে করতে গেলে এক বছর লেগে যায়। পুরোপুরি এভাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করতে হলে জাতীয় নির্বাচনের সময় পিছিয়ে যাবে। জাতীয় নির্বাচন এখন আমাদের অগ্রাধিকার। ইসি জাতীয় নির্বাচন নিয়েই এ মুহূর্তে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের, সেটা সেভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা সরকারের সিদ্ধান্ত।
বিএনপি শুরু থেকেই জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছে। দলটির নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন করা। তা ছাড়া এ ধরনের সরকারের অধীনে অতীতে কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার নজিরও নেই। আর ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এর আরো বেশি যৌক্তিকতা নেই। কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে সরকারের মূল যে লক্ষ্য, সেখান থেকে বিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন- এগুলো দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।
বিএনপির আরো শঙ্কা, এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে সেটা ‘পতিত’ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনেরও একটা মাধ্যম হতে পারে। কেননা, এই নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সেক্ষেত্রে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের লোকজন প্রার্থী হলে তাদের যেমন ঠেকানো যাবে না, তেমনি তৃণমূলে ব্যাপক হাঙ্গামা-সংঘর্ষও হতে পারে। যেটা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে যাবে। আর সেই হাঙ্গামা-সংঘর্ষের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়তে পারে। সুতরাং সরকার এ ধরনের নির্বাচনের উদ্যোগ নিলে তাদের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যেতে পারে।
বিএনপি গত মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত হচ্ছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ, এখন পুরো দেশ ও জাতির ফোকাসটা হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন না চাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে দলটি তখন বলেছিল, সঙ্কটটা ওই জায়গাতে, দেশে গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। মানুষ সেজন্য একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র উত্তরণের পথ পাড়ি দিতে চায়। তা ছাড়া স্থানীয় সরকার দেশ চালায় না। দেশ চালায় জাতীয় সংসদ, আইন প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদ। ফলে গণতন্ত্রের মূল বিষয়টি হচ্ছে জাতীয় সংসদ, এটা কার্যকর হলে গণতন্ত্র সচল হয়। বিএনপি তখন এ-ও জানিয়েছিল, স্থানীয় সরকারের তৃণমূল স্তর হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। সেই ইউনিয়ন পরিষদই তো সরকার এখনো বাতিল করেনি। সেটা যদি বাতিল না করে, সেখানে কীভাবে লোকাল গভর্নমেন্ট নির্বাচন হবে?
এদিকে সপ্তাহ দুই আগে যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সাথে বৈঠকে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা পুনরায় জানিয়েছে বিএনপি। গত শনিবারও যমুনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিটির সাথে বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন নয়।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, তারা গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, যেটি সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে স্থানীয় নির্বাচনের কথা মাথায় আনা যাবে না। কারণ, পতিত আওয়ামী লীগ গর্তের ভেতর মাথা লুকিয়ে রেখেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সাথে সাথে তারা গর্ত থেকে মাথা বের করবে, আবারো মাথাচাড়া দেবে। তাই আওয়ামী লীগকে সেই সুযোগ দেয়া যাবে না।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না চাওয়ার বিষয়টি আমাদের দলীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত। আইনি এবং সাংবিধানিক বিষয়াবলি বিবেচনায় নিয়ে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তা ছাড়া এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব ও প্রধানতম অগ্রাধিকার হচ্ছে, একটি অবাধ-গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা। এর আগে তাদের অন্য কোনো অগ্রাধিকার নেই।
তিনি আরো বলেন, দেশে স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার সংস্কার কার্যক্রম করছে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে সেটা হতে হবে। এখন যদি আমরা অগ্রাধিকার ঠিক না করি, দেশে একটি ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। দেশে এ ধরনের সরকারের অধীনে অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নজির নেই।
বর্ধিত সভা ডেকেছে বিএনপি : এদিকে দীর্ঘ সময় পর কাউন্সিলের আদলে দলের বর্ধিত সভা আহ্বান করেছে বিএনপি। আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এই সভা অনুষ্ঠিত হবে । নতুন এই সাংগঠনিক সিদ্ধান্তকে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলকে সাংগঠনিক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বৃহৎ এই আয়োজনে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে যারা দলের প্রার্থী হয়েছিলেন তারা থাকবেন, পাশাপাশি সম্ভাব্য যারা প্রার্থী এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতারাও অংশ নেবেন।
বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে ১৯ মার্চ। এর প্রায় ৮ বছর পরে দলের এত বড় একটা সাংগঠনিক আয়োজন বা পুনর্মিলন হতে যাচ্ছে। তবে এর স্থান এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর আগে ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা করেছিল বিএনপি। রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে তখন গ্রেফতার আতঙ্কের মধ্যেই দলটির নির্বাহী কমিটির প্রায় ৮০ ভাগ সদস্য উপস্থিত হয়েছিলেন। ওই সভায় নেতাদের যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকা এবং বিএনপির পতাকাতলে থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর চার দিন পরে ৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের একটি মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাবস্থায় ওই বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু পরে কারচুপির অভিযোগ এনে ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করে তারা।
গতকাল রোববার বিকেলে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বর্ধিত সভার তারিখ ঘোষণা করে বলেন, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে যারা দলের প্রার্থী ছিলেন এবং দলের টিকিট অর্থাৎ প্রার্থী নন কিন্তু মনোনয়নের জন্য ‘সেকেন্ডারি’ কাগজ পেয়েছিলেন, তারাও বর্ধিত সভায় থাকবেন। এ ছাড়া বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এবং জেলা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক, সদস্য সচিব; থানা-উপজেলা-পৌর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবরা অংশ নেবেন বর্ধিত সভায়। বিএনপি ছাড়া ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরাও থাকবেন সেখানে। তবে এদের মধ্যে যারা ইতোমধ্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন, তারা এই বর্ধিত সভায় অংশ নিতে পারবেন না।